বামাকালী: শান্তিপুরের অনন্য শাক্ত ঐতিহ্য
কেউ হয়তো কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের গলা শুনে বলবে—“একবার নাচো, নাচো গো শ্যামা নাচো এমন করে”—কানে বাজলেই মনে পড়ে ওই বামাকালীর নাচের দৃশ্য। ইনস্টাগ্রামের রিলসে বা ফেসবুকের ফিডে, এই ভিডিয়োটা প্রায় সবারই চোখে পড়েছে। শান্তিপুর মানেই একটা অনন্য মেলবন্ধন—বৈষ্ণব ভাবনা, শাক্ত সাধনা, তাঁতশিল্প, আর টগবগে ইতিহাস। একদিকে যেমন শ্রীচৈতন্যের ছোঁয়া, তেমনই রয়েছে তন্ত্র আর কালীসাধনার ছাপ। আর সেখানেই বামাকালী পুজো—এই শহরের এক আলাদা গর্ব।
ইতিহাস: যমুনা চৌধুরীর স্বপ্নাদেশ ও ১৯৬৯
ইতিহাস নিয়ে অবশ্য তর্ক আছে। অনেকেই বলেন পুজোটা পাঁচশো বছরের পুরোনো, আবার কেউ বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুটা ১৯৬৯-এ ঘটপুজো দিয়ে, ১৯৭০-এ প্রতিমা পুজো। এই বিতর্ক থাক, পুজোর মাহাত্ম্যে তা বিন্দুমাত্র কমতি আনে না।
বামাকালী পুজো নিয়ে সবচেয়ে মজার গল্পটা ঘুরে বেড়ায় যমুনা চৌধুরীর নাম ঘিরে। প্রচলিত গল্প বলছে, একদিন স্বপ্নে দেবী কালীর দেখা পেয়েছিলেন যমুনা চৌধুরী। দেবী স্বপ্নে তাঁকে স্পষ্ট বলেছিলেন, “আমার আরাধনা শুরু করো।” এক সাধিকার স্বপ্ন থেকেই শুরু, আর সেই ছোট্ট শুরুই—কালক্রমে—শান্তিপুরের বড় কালীপুজোয় হয়ে ওঠে। প্রথমে দেবী ‘যমুনাকালী’ নামে পরিচিত ছিলেন, পরে নাম হয় বামাকালী।
নামের উৎপত্তি: কেন ‘বাম’ কালী?
বামাকালীর নাম বা বিশেষত্বের কথায় আসলে—অন্য কালীমূর্তিতে দেবী শিবের বুকে ডান পা রাখেন। কিন্তু শান্তিপুরের বামাকালী বুকের ওপর বাম পা রেখে দাঁড়িয়ে—তাই তাঁর নাম ‘বামাকালী’। শাক্তভাবনায় কালী শুধু ধ্বংসের নয়—অজ্ঞানতা সরানো, অশুভর বিনাশ আর নতুন শক্তির জন্ম—সব একসাথে নিয়ে এলেন তিনি। খড়্গ হাতে, মুণ্ডের মালা গলায়, দাপুটে মুখে কাঁপন ধরান—তবু তাঁর এই ভয়াল রূপের মধ্যেই ভক্তেরা মাতৃমাধুর্য দেখতে পায়। ভয়ের মাঝখানে কোথাও যেন মমতার ঝলক, এটাই বামাকালীর আসল রূপ।
মশালের আলোয় পুজো: বিদ্যুৎ নিষিদ্ধ
আজকাল বেশিরভাগ কালীপুজোতেই দেখা যায় ঝমঝমে বাইরের আলো, রঙিন লাইট আর উচ্চ প্রযুক্তির আলোকসজ্জা। কিন্তু বামাকালী পুজোয় মশাল, প্রদীপ আর মোমবাতির আলো ছাড়া কিছু নেই। এখানকার রীতি—পুজোর শুরু থেকে বিসর্জন পর্যন্ত একটাও বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে না। পুরো সময়টা শুধুই প্রদীপ, হ্যাজাক, মশালের আলোয়। উদ্যোক্তারা পুরোনো ঐতিহ্যটা আগলে রেখেছেন, বদলাননি। তাই সেই আধো অন্ধকারে মশালের দীপ্তিতে দেবীমূর্তির আবির্ভাব—দেখলে যে কারও মনে অন্যরকম এক অনুভূতি জাগে।
বিসর্জনের আগে দেবীর নাচ
আসলে বামাকালী পুজোর জমাটি মুহূর্ত আসে বিসর্জনের আগে—যখন দেবীর নাচ হয়। হাজার হাজার মানুষ শুধু এই দৃশ্যটা দেখতে ভিড় করেন। পুজোর পরদিন মণ্ডপ থেকে প্রতিমাকে নিয়ে বার করা হয়। বড় এক বাঁশের ফ্রেমে বসানো দেবীমূর্তি ভক্তরা দল বেঁধে কাঁধে তুলে নেন। তারপর কাঁসর, ঢাক আর অসংখ্য গলার জয়ধ্বনি গর্জে ওঠে—আর তার মাঝেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভক্তরা শুরু করেন নাচ। এই দৃশ্যটা দেখতে শান্তিপুর শুধু নয়, আশপাশের লোকেরাও ছুটে আসেন। মশালের কোমল আলো, ঢাকের তালে তালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নৃত্য, আর—সবচেয়ে বড় কথা—মানুষের আবেগে গড়ে ওঠা এক অমূল্য দৃশ্য। কত ছোট-বড় গল্প, লোককথা আর স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে। শেষমেশ বামাকালী পুজো আর বিসর্জনের ঠিক আগে চেনা যায় তার আলাদা জনপ্রিয়তা—যার কাছে ফিকে হয়ে যায় শহুরে আলোর চাকচিক্য।
সূত্র ও রেফারেন্স
- Asianet News Bangla — Shantipur Bamakali: মশালের আলোয় জাগ্রত মা বামাকালী! শান্তিপুরের বুকে এক অনন্য শাক্ত ঐতিহ্যের বিস্ময়কর কাহিনি
- আনন্দবাজার — শান্তিপুরের বামাকালীর নাচের স্থানবদল! আবাহন থেকে বিসর্জন, কোথাও বিদ্যুতের আলো ব্যবহার করা হয় না
- News18 — Shantipur's Famous Bama Kali Dance Is Moving After 56 Years: The Story Behind Bengal's Extraordinary Ritual