পুরোনো স্লোগান থেকে নতুন স্লোগান
"মা সবার, এটা আলাদা করে জানানোর দরকার নেই"—নৈহাটির বড়মা মন্দিরের বহু পুরোনো স্লোগান বদলে দেওয়ার পেছনে এমনটাই বলছে মন্দির কমিটি। নৈহাটির বিখ্যাত বড়মা মন্দির চত্বরে এতদিন টাঙানো ছিল সেই উন্নতি-মাখা পুরোনো লাইনটা—"ধর্ম যার যার, বড়মা সবার।" কঠিন সময়েও এই কথাতেই জমে থাকত মন্দিরের চারপাশের সম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা ছড়াত হাজার মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু এবার সেই লাইন সরিয়ে, জায়গা পেয়েছে অন্য স্লোগান: "বড় মায়ে ভক্তি, সনাতনের শক্তি।" কালীপুজো আসার মুখে এমন বদল, স্বাভাবিকভাবেই দানা বেঁধেছে বিতর্ক। রাজনীতি থেকে ভক্ত, আলোচনা চলছে সবার মধ্যেই।
মন্দির কমিটির যুক্তি
মন্দির কর্তৃপক্ষ বলছে, সিদ্ধান্তটা হঠাৎ নেওয়া হয়নি। রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে বছরের পর বছর ধরে বহু ভক্ত আর হিন্দু সংগঠন মিলে স্লোগান বদলানোর দাবি জানিয়ে আসছিল। মন্দির কমিটির অন্যতম সদস্য অর্ণব রায় জানিয়েছেন, "মা যে সবার, সেটা আলাদা করে বলে বেড়ানোর দরকার কী? মসজিদ-গির্জা কোথাও তো এরকম লেখা থাকে না। আমাদের সনাতনী ভাবনা আর ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতেই এই বদল।" কমিটির অন্যরাও জানিয়েছেন, বহু ভক্তের আবেগ আর সনাতন চিন্তার ভাবমূর্তি বজায় রাখার জন্য সবাই মিলে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন।
রাজনীতির ছায়া? বিধায়কের বক্তব্য
এদিকে, এই বদলের পিছনে রাজনীতির ছায়া আছে কিনা—এই প্রশ্নও উঠেছে, কিন্তু স্থানীয় বিধায়ক সুমিত্র চট্টোপাধ্যায় সাফ জানিয়েছেন, "এতে কোনও রাজনীতি নেই। নৈহাটির মানুষ বা সনাতনী ভক্তরাই বরাবর দাবি করে আসছিলেন, মন্দিরে যেন সনাতনী চিন্তার ছাপ পড়ে। সেই কথা ভেবেই নতুন স্লোগান আনা হয়েছে, এখানে তোষণ-রাজনীতির কোনো জায়গা নেই।"
তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলের একাংশ এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, পুরোনো স্লোগানটি ছিল সম্প্রীতির প্রতীক এবং তা বদলানো উচিত হয়নি।
ভক্তদের প্রতিক্রিয়া: দুই ভাগ
নতুন স্লোগান নিয়ে ভক্তদের প্রতিক্রিয়া মিলেমিশে গেছে। কেউ আনন্দে—একজন মহিলা ভক্ত বললেন, "আগে এত ভিড় থাকত, এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে পুজো দিতে পারতাম না—এখন শান্তিতে ক'টা সময় কাটানো যাচ্ছে, সেটাই ভালো লাগছে। সনাতনের শক্তি কতটা, জানি না; কিন্তু মন ভরে গেছে।"
আবার কারও মনখারাপ। কারও মতে, বড়মা মানেই তো সকলের মা—এই সার্বজনীনতাই তো বড়মার আসল মাহাত্ম্য। তাদের অনেকের দাবি, আগের সেই চেনা লাইনটাই বড়মার সঙ্গে মানানসই ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই দুই দলের মধ্যে তুমুল আলোচনা চলছে।
বড়মার মাহাত্ম্য ও ঐতিহ্য
নৈহাটির বড়মা মন্দিরের ইতিহাস প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো। কথিত আছে, এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন হরিনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পরিবার। প্রতি বছর কালীপুজো উপলক্ষে এখানে লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম হয়। বড়মার ভোগ ও বিশেষ পুজোর জন্য সারা বাংলা থেকে মানুষ আসেন।
এই মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। এখানকার কালীপুজো দেখতে বহু পর্যটকও আসেন। নতুন স্লোগান বিতর্ক মন্দিরটিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে নৈহাটি বড়মা মন্দিরের নতুন স্লোগান নিয়ে এখন সরগরম গোটা রাজ্য। কারও গলায় উচ্ছ্বাস, কারও মনে খচখচে, কিন্তু আলোচনা জারি রেখেছেন সবাই।
সূত্র ও রেফারেন্স
- আনন্দবাজার — কালীপুজোর আগে বড়মা মন্দিরে স্লোগান বদল, ‘ধর্ম যার যার’ সরিয়ে ‘বড় মায়ে ভক্তি, সনাতনের শক্তি’
- সংবাদ প্রতিদিন — ‘মা যে সবার, আলাদা করে বলার দরকার কী?’ পুরোনো স্লোগান বদল নিয়ে মন্দির কমিটির সাফ জবাব
- এই সময় — ‘এতে কোনো রাজনীতি নেই’, বড়মা মন্দিরের নতুন স্লোগান নিয়ে বিধায়কের প্রতিক্রিয়া