মিড ডে মিল স্কিম (PM পোষণ) ২০২৬ – সুবিধা, অসুবিধা ও কলকাতায় ইসকন

২৬ জুন, ২০২৬ লেখক: Deb Sarkar পড়তে ৬ মিনিট
মিড ডে মিল স্কিম

মিড ডে মিল স্কিম কি? মধ্যাহ্নভোজন প্রকল্প, এখন যার নাম পিএম পোষণ, আসলে ভারতের স্কুলের পড়ুয়াদের জন্য সরকারের নেওয়া একটা বড় পদক্ষেপ। ১৯৯৫ সালে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য—প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণির সরকারি এবং সরকার সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিদিন রান্না করা পুষ্টিকর খাবার দেওয়া, একেবারে বিনামূল্যে।

Mid day meal scheme in west bengal (মিড ডে মিল স্কিম)

২০২১ সালে প্রকল্পের নাম পাল্টে “পিএম পোষণ” হয়েছে। এখন দেশের ১১ লক্ষের বেশি স্কুলে প্রায় ১১ কোটিরও বেশি শিশু নিয়মিত এই খাবার পায়। এমন প্রচুর মানুষের কাছে পৌঁছনো বলেই এটি বিশ্বে অন্যতম বড় স্কুলভিত্তিক খাদ্য প্রকল্প হয়ে উঠেছে।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের খাবারের ব্যবস্থায় স্কুলে উপস্থিতি বাড়ে, মনোযোগ বাড়ে, আর সবচেয়ে বড় কথা—শিশুদের পুষ্টি বেশ উন্নত হয়। সেটা তো বোঝাই যায়, পেট ভরা থাকলে পড়ায়ও মন বসে বেশি।

সংক্ষেপে যদি বলি, পিএম পোষণ প্রকল্প ঠিক কী? ১১ কোটিরও বেশি ছাত্রছাত্রীকে সরকারি খরচে রোজ রান্না করা খাবার দিচ্ছে সরকার। এখানে যোগ্যতা বললে—প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রী, এমনকি বালবাটিকা বা প্রাক-প্রাথমিক বিভাগও এতে অন্তর্ভুক্ত।

২০২৬-২০২৭ সালের বাজেটে কেন্দ্রীয় সরকার ১২,৭৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে এই প্রকল্পের জন্য। লক্ষ্য একটাই—শ্রেণিকক্ষে ক্ষুধার জায়গা নেই, স্কুলে ভর্তি বাড়ুক, আর যেসব পরিবারে খাবারের টানাটানি, তাদের সন্তানেরা অন্তত স্কুলে একটা পুষ্টিকর খাবার পাক।

এরপর, এখন খাবারে আয়রন, বি১২, ফলিক অ্যাসিড বাড়াতে জোর দেওয়া হচ্ছে। অনেক স্কুলে নিউট্রি-গার্ডেন বা পুষ্টিবাগান গড়া হচ্ছে, যাতে খাদ্যের মান আরও বাড়ে।

মিড ডে মিল স্কিমের সুবিধা ও অসুবিধা

এই প্রকল্প চালু হয়েছিল দুইটি বড় চ্যালেঞ্জের জন্য—বাংলার মতো দেশজুড়ে বহু শিশু অপুষ্টিতে ভুগছিল, অনেকে ঠিকমতো স্কুলেও যেত না। মধ্যাহ্নভোজের ফলে, রোজ অন্তত একটা পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে বাচ্চারা। বিশেষ করে গরিব পরিবারে স্কুলে ভর্তি ও উপস্থিতিও বেড়েছে।

  • ✅ সুবিধা: স্কুলে থেকে যেতে উৎসাহিত হয় বলে ঝরে পড়ার হারও কমেছে। শুধু তাই নয়, সবাই একসাথে মিলে খেয়ে নেওয়ায় সামাজিক সাম্যবোধও বাড়ে। আর, দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর দৈনন্দিন খাবারের চাপ কিছুটা কমে যায়, এতে তাদের সন্তান পড়াতে সাহস পায়।
  • ⚠️ অসুবিধা: অনেক সময় খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কলকাতার স্কুলে মিড ডে মিল নিয়ে এতদিন নানা অভিযোগ উঠেছিল—কখনও খাবারে টিকটিকি, কখনও আবার আরশোলাও পাওয়া গেছে। এছাড়া সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করাও চ্যালেঞ্জিং।
🔹 কে কে এই প্রকল্পে সুযোগ পাবে?
সরকারি ও সরকার সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল, স্থানীয় সংস্থা পরিচালিত স্কুল, শিক্ষা নিশ্চয়তা প্রকল্পের স্কুল, সর্ব শিক্ষা অভিযানের অধীনে থাকা মাদ্রাসা-মক্তব—সব মিলিয়ে একেবারে প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্ররা এই সুবিধা পাবে।

কলকাতায় বড় পরিবর্তন – ইসকনের হাতে মিড ডে মিল

কলকাতার স্কুলে মিড ডে মিল নিয়ে এতদিন নানা অভিযোগ উঠেছিল—কখনও খাবারে টিকটিকি, কখনও আবার আরশোলাও পাওয়া গেছে। খাবারের মান নিয়ে আতঙ্ক ছিল প্রচুর। এবার এসব বন্ধ করতে বড় পদক্ষেপ নিল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। নতুন বাজেট ঘোষণার পর মুখ্যমন্ত্রী জানালেন, কলকাতার স্কুলে মিড ডে মিলের দায়িত্ব এবার ইসকনের হাতে।

এতদিন মিড ডে মিল বাবদ ছাত্রপিছু মাত্র সাড়ে ৬ টাকা বরাদ্দ থাকত, সেটা বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি—এতে ছেলেমেয়েরা বেশি পুষ্টিকর খাবার পাবে। বাজেট ভাষণ শেষেই মুখ্যমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত-সহ সাংবাদিকদের সামনে স্পষ্ট বলেন, “বাংলা শ্যামাপ্রসাদ, স্বামী বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ মিশন, গৌড়ীয় মঠ, ভারত সেবাশ্রম, আর ইসকনের দেখানো পথেই চলবে। সংস্কৃতি থেকে সরে আসার প্রশ্নই নেই। আমরা ইসকনকেই মিড ডে মিলের খাবার দেওয়ার দায়িত্ব দিচ্ছি। আপত্তি থাকলে কেউ হরে কৃষ্ণ বলতে বাধ্য করবেনা। কেউ যেন ভয় না পায়—খাবার ভালো, খাবার শুদ্ধ, চিন্তার কারণ নেই।”

বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে মিড ডে মিলের মান ও রান্নার পরিবেশের উন্নয়নে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। রান্নার কাজ করা দিদিদের মাইনেও বাড়লো, মাসে ১০০০ টাকা করে। ইসকনের হাতে কলকাতার মিড ডে মিল তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এখন অনেকটাই চূড়ান্ত।

ইসকনের মেনু – ডিম বাদ, কী থাকছে?

অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—এবার তবে স্কুলে ডিম পড়ুয়ারা পাবে তো? ইসকনের কলকাতা শাখার সহ-সভাপতি রাধারমণ দাস জানালেন, ২০০৪ সাল থেকে তারা মিড ডে মিল প্রকল্পে আছে। এখনো দেশের আটটি রাজ্যে, যেমন দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে মিড ডে মিল দেয় তারা। সব জায়গায়ই গৌড়ীয় ভাবধারা মেনে নিরামিষ খাবার পরিবেশন হয়।

কেউ কেউ প্রাণীজ প্রোটিনের কথা তুলছেন—রাধারমণ বললেন, “আমরা মেনুতে সোয়াবিন, রাজমা, পনীর এসব রাখব। প্রোটিনে কমতি হবে না।” রান্না হরিয়ানার মতো একটা কেন্দ্রীয় কিচেনে হবে কিনা, সে নিয়েও কথা চলছে। কলকাতার যানজটের জন্য সেটা কঠিন—এসব নিয়ে শিক্ষা দপ্তরের সাথে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ইসকন।

ইসকনের ভাইস প্রেসিডেন্ট আরও জানিয়েছেন, খিচুড়িতে মিশবে প্রচুর সয়াবিন, কারণ এতে থাকে বেশি প্রোটিন। পনির, রাজমা—এসবও থাকবে নিয়মিত। শুধু খিচুড়ি নয়, সপ্তাহের আলাদা দিনে থাকবে ভাত, ডাল, নানারকম সবজি। মাঝে মধ্যে রসগোল্লা কিংবা গোলাপজামও থাকতে পারে।

কলকাতার সব সরকারি বিদ্যালয়ে ইসকন এই মিড-ডে মিল সরবরাহ করবে। এর জন্য আলাদাভাবে বড় কিচেন বানাবে ইসকন ফাউন্ডেশন, যেখানে পুরোটাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রান্না হবে, একটা ফাইভ স্টার হোটেলের মতো। সব কিছু হ্যান্ডেল করবে ইসকন কলকাতা। আপাতত জেলার স্কুলগুলোতে পুরনো নিয়মেই মিল চলবে, কারণ এখনো প্রধান দপ্তর মায়াপুর থেকে নতুন কোনও নির্দেশ আসেনি।

ভারতের নানা রাজ্যে—যেমন দিল্লি, মহারাষ্ট্র—ইসকন আগে থেকেই মিড-ডে মিলের দায়িত্বে। কলকাতাতেও একে পাইলট প্রজেক্ট ভাবা হচ্ছে। ইসকনের ‘অন্নামৃত ফাউন্ডেশন’ দেশজুড়ে বহু বছর ধরে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পুষ্টিকর খাবার যোগাচ্ছে। এবার কলকাতাতেও সেই পরিকল্পনা চালু হচ্ছে, একদম নতুন কিচেন, স্বচ্ছন্দ ও আধুনিক পরিবেশে।

🔹 শেষ কথা:
মিড ডে মিল স্কিম বা PM পোষণ প্রকল্প ভারতের শিক্ষা ও পুষ্টি ব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কলকাতায় ইসকনের এই নতুন উদ্যোগ খাবারের মান বাড়াবে বলে আশা করা যায়। তবে ডিম বাদ দেওয়া নিয়ে কিছু অভিভাবকের মধ্যে প্রশ্ন থাকলেও, ইসকন প্রোটিনের বিকল্প ব্যবস্থা রাখার কথা জানিয়েছে। সময়ই বলে দেবে এই পরিবর্তন কতটা সফল হয়।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

শেয়ার বাটনে ক্লিক করলেই সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট শেয়ার হবে।

Deb Sarkar

লেখক: Deb Sarkar

Deb Sarkar পশ্চিমবঙ্গের সরকারি প্রকল্প, কেন্দ্রীয় সরকারি স্কিম, ডিজিটাল পরিষেবা এবং অনলাইন আয়ের বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। তিনি বিভিন্ন সরকারি বিজ্ঞপ্তি, অফিসিয়াল পোর্টাল এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করে পাঠকদের কাছে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন।

✓ Fact Checked Content ✓ Government Scheme Researcher ✓ Updated Information