পয়া মাঠ কিশোরভারতী: সাথীর কাছে কেন বিশেষ

এই ম্যাচটা ইস্টবেঙ্গলের মিডফিল্ডার সাথী দেবনাথের জন্য বিশেষ। কিশোরভারতী স্টেডিয়াম তাঁর কাছে শুধু একটি মাঠ নয়, বরং এক আবেগের নাম। এই মাঠেই সাথী তাঁর প্রথম ট্রফি—কন্যাশ্রী কাপ—জিতেছিলেন ২০২৩ সালে। সেবার ফাইনালে শ্রীভূমিকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। সেই জয়ের স্মৃতি আজও তাঁর মনে গেঁথে আছে।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সাথী বললেন, “কিশোরভারতী আমার জন্য, আমাদের ইস্টবেঙ্গলের জন্য সবসময় স্পেশ্যাল। এখান থেকেই সাফল্যের শুরু, এখানেই প্রথম ট্রফি। এবারও চেষ্টার কোনো কমতি রাখব না, নিজের সেরাটা দেব।” তাঁর কণ্ঠে যে আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ছিল, তা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল—তিনি এই ম্যাচটাকে শুধু একটি ম্যাচ হিসেবে দেখছেন না, বরং নিজের কেরিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন।

২০২৩ সালের সেই কন্যাশ্রী কাপ জয়ের পর সাথী দেবনাথের কেরিয়ার নতুন মোড় নেয়। তিনি ইস্টবেঙ্গলের নিয়মিত সদস্য হয়ে ওঠেন। পরে ভারতীয় জাতীয় দলের শিবিরেও ডাক পান। তবে সেই প্রথম ট্রফির স্মৃতি তাঁকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে। এখন সেই একই মাঠে, এবার এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্লাব প্রতিযোগিতায় নামছেন তিনি।

ম্যাচ
ইস্টবেঙ্গল বনাম হো চি মিন সিটি
তারিখ
১ নভেম্বর ২০২৬
ভেন্যু
কিশোরভারতী, কলকাতা
গ্রুপ
বি

কন্যাশ্রী কাপ থেকে AFC: সাথীর উত্থানের গল্প

সাথী দেবনাথের ফুটবল যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তাঁর টান ছিল। কিন্তু মেয়েদের ফুটবলকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া সেই সময়ে সহজ ছিল না। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। ধীরে ধীরে স্থানীয় টুর্নামেন্টে খেলতে শুরু করেন। তাঁর প্রতিভা নজরে আসে ইস্টবেঙ্গলের কোচদের।

২০২২-২৩ মরশুমে ইস্টবেঙ্গলের মহিলা দল কন্যাশ্রী কাপে অংশ নেয়। সেবার দলটিকে গড়ে তোলা হয়েছিল বেশ কিছু তরুণ ফুটবলারকে নিয়ে। সাথী ছিলেন সেই দলের অন্যতম। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন তিনি। ফাইনালে শ্রীভূমির বিরুদ্ধে ১-০ গোলে জয় পায় ইস্টবেঙ্গল। সেই জয়ের মাধ্যমে ইস্টবেঙ্গল কন্যাশ্রী কাপ জেতে এবং আইডব্লিউএলে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।

সেই থেকেই সাথীর কেরিয়ার বদলে যেতে শুরু করে। তিনি ইস্টবেঙ্গলের ডিফেন্সের অন্যতম ভরসার নাম হয়ে ওঠেন। পরে ক্যাপ্টেন স্বেতী দেবীর চোটের সময় তাঁকে সেন্টার-ব্যাক পজিশনে খেলানো হয়। সেই চ্যালেঞ্জও তিনি সফলভাবে সামলেছেন। অভিজ্ঞ অশালতা দেবীর সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি দলের ডিফেন্সকে মজবুত করেছেন।

২০২৫-২৬ মরশুমে ইস্টবেঙ্গল প্রথম ভারতীয় ক্লাব হিসেবে মহিলা ফুটবলে ট্রেবল জেতে—সাফ উইমেন্স ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ, ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগ এবং কন্যাশ্রী কাপ। সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের অংশীদার ছিলেন সাথী দেবনাথও। এখন সেই দলের সঙ্গে তিনি নামছেন এশিয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চে।

প্রস্তুতি ও ফিটনেস: দীর্ঘ বিরতির পরও চাপ নেই

ইস্টবেঙ্গলের মেয়েরা শেষবার প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলেছিল অগস্টে। মাঝে বেশ কিছুটা সময় গেছে, কিন্তু সাথী বা তাঁর দলবুঝু চাপ নিচ্ছে না। সাথীর কথায়, “প্রাক-মরশুমে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট রুটিন বানানো হয়েছিল। সেটাই আমরা ঠিকমতো মেনেছি, সবাই নিজেদের ফিট রেখেছি।”

এই দীর্ঘ বিরতির কারণটি হলো—ভারতে এখনও ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগ (IWL) শুরু হয়নি। অন্যদিকে হো চি মিন সিটি তাদের ঘরোয়া লিগ শেষ করেই এসেছে। ফলে ম্যাচ ফিটনেসের দিক থেকে ভিয়েতনামের দল কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারে। কোচ অ্যান্থনি অ্যান্ড্রুজ এই বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, “লিগ থাকলে ম্যাচ খেলে কম্বিনেশন গড়ে নেওয়া যেত। এখন প্রস্তুতিই একমাত্র ভরসা।”

তবে এই ঘাটতি পূরণে ইস্টবেঙ্গল কোচ বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছেন। দল নিয়মিতভাবে অনূর্ধ্ব-১৫ এবং অনূর্ধ্ব-১৭ ছেলেদের দলের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে। এর উদ্দেশ্য—আন্তর্জাতিক ফুটবলের গতি এবং শারীরিক তীব্রতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। কোচের কথায়, “আমরা নিয়মিত ছেলেদের দলের বিরুদ্ধে ম্যাচ খেলেছি, যাতে নিজেদের সীমা বাড়াতে পারি এবং শীর্ষস্তরের মহাদেশীয় ম্যাচের গতি ও তীব্রতার সঙ্গে অভ্যস্ত হতে পারি।”

প্রতিপক্ষ হো চি মিন সিটি: কেন তারা বিপজ্জনক

হো চি মিন সিটি উইমেনস এফসি ভিয়েতনামের সবচেয়ে সফল মহিলা ফুটবল ক্লাব। ১৯৯৮ সালে গঠিত এই দলটি ভিয়েতনামি উইমেন্স ন্যাশনাল লিগ ১৫ বার জিতেছে। ২০২০ সাল থেকে তারা টানা সাতবার লিগ জিতেছে। এছাড়া ভিয়েতনামি উইমেন্স ন্যাশনাল কাপও পাঁচবার জিতেছে তারা।

এএফসি উইমেন্স চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তাদের অভিজ্ঞতাও কম নয়। ২০২৪-২৫ মরশুমে তারা সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। শেষ মরশুমে কোয়ার্টার ফাইনালে বাদ পড়ে। এই দলের অন্যতম বড় শক্তি—ভিয়েতনাম জাতীয় দলের একাধিক অভিজ্ঞ ফুটবলার। বিশেষ করে হুইন নু-এর নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি ১০০-র বেশি গোল করেছেন এবং ভিয়েতনাম জাতীয় দলের হয়ে ৭০-এর বেশি ম্যাচ খেলেছেন।

হো চি মিন সিটির কোচ দোয়ান থি কিম চি একজন ভিয়েতনামি কিংবদন্তি। তিনি চারবার ভিয়েতনামি উইমেন্স গোল্ডেন বল জিতেছেন। ২০১৫ সাল থেকে তিনি এই দলের কোচ। তাঁর অধীনে দলটি ঘরোয়া ফুটবলে একাধিপত্য বিস্তার করেছে।

এই ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলের ডিফেন্সের বড় চ্যালেঞ্জ হবে হুইন নুকে আটকানো। ক্যাপ্টেন স্বেতী দেবীর সঙ্গে সাথী দেবনাথকেও ডিফেন্সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। যদি তারা হুইন নুর মুভমেন্ট和控制 করতে পারেন, তাহলে ইস্টবেঙ্গলের জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে।

কৌশল: দ্রুত পাস ও আক্রমণের গতি

কী হতে চলেছে ইস্টবেঙ্গলের স্ট্র্যাটেজি? গতবার গ্রুপ লিগ পেরোতে পারেনি দল। প্রথম ম্যাচে জিতলেও শেষ দু’ম্যাচে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল ‘মশাল গার্লস’-দের। তবে এবার সব ম্যাচই ঘরের মাঠে—যদিও সুবিধে যেমন আছে, চ্যালেঞ্জও কম নয়, বলছেন কোচ অ্যান্থনি অ্যান্ড্রুজ।

তাঁর কথায়, “আন্তর্জাতিক লেভেলে খেলার গতি অনেক দ্রুত, সেটা ভেবে প্রস্তুতি নিয়েছি। দলে কয়েকজন বিদেশিও এসেছে। সবাই পরিশ্রম করছে, সেটার ফল মাঠে দেখতে চাই।” ইস্টবেঙ্গল এই মরশুমে দলে যোগ করেছেন জাপানি মিডফিল্ডার হিতোমি তানাকা এবং ঘানার তিন ফুটবলার—অলিভিয়া অ্যানোকি, আদামা আলহাসান এবং অ্যাবিগেল আন্টভি। এছাড়া ভারতীয় তারকা রিম্পা হালদার ও থোইবিসানা চানুও দলে এসেছেন।

মূল কৌশল হবে মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং দ্রুত পাসে আক্রমণে ধার আনা। ফরোয়ার্ড লাইনে উগান্ডার ফজিলা ইকোয়াপুটের ওপর ভরসা রাখবে দল। গত মরশুমে আইডব্লিউএলে ২০ গোল করে তিনি লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। তাঁর গোল করার ক্ষমতা ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণকে শক্তিশালী করবে।

ইতিহাসের হাতছানি: নকআউটে পৌঁছানো কি সম্ভব

এএফসি উইমেন্স চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ইস্টবেঙ্গল এর আগে একবার গ্রুপ পর্বে খেলেছিল। গত মরশুমে তারা প্রথম ভারতীয় ক্লাব হিসেবে এই প্রতিযোগিতার গ্রুপ পর্বে ম্যাচ জিতেছিল। এবার তাদের লক্ষ্য আরও বড়—নকআউট পর্বে পৌঁছানো।

এই প্রতিযোগিতায় ১২টি দল অংশ নিচ্ছে। তাদের মধ্যে আটটি দল কোয়ার্টার ফাইনালে উঠবে। তিন গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন, তিন রানার্স-আপ এবং দুটি সেরা তৃতীয় স্থানাধিকারী দল কোয়ার্টার ফাইনালে খেলবে। তাই গ্রুপ পর্বে ভালো ফল করা অত্যন্ত জরুরি।

ইস্টবেঙ্গলের গ্রুপে রয়েছে ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটি, দক্ষিণ কোরিয়ার হোয়াচন কেসপিও এবং উত্তর কোরিয়ার ৪.২৫ এসসি। তিন প্রতিপক্ষই নিজ নিজ দেশের ঘরোয়া লিগের চ্যাম্পিয়ন। তাই চ্যালেঞ্জ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। ঘরের মাঠের সুবিধা কাজে লাগিয়ে ইস্টবেঙ্গল চমক দিতে পারে।

কোচ অ্যান্থনি অ্যান্ড্রুজ: রেকর্ড গড়া কোচ

ইস্টবেঙ্গল মহিলা দলের কোচ অ্যান্থনি অ্যান্ড্রুজ ভারতীয় মহিলা ফুটবলের অন্যতম সফল কোচ। তিনি আইডব্লিউএলে চারটি শিরোপা জিতেছেন—দুটি গোকুলাম কেরালার সঙ্গে এবং দুটি ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে। তিনিই একমাত্র কোচ যিনি একাধিক আইডব্লিউএল শিরোপা জিতেছেন।

২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ মরশুমে তিনি ইস্টবেঙ্গলকে টানা দুবার আইডব্লিউএল জিতিয়েছেন। এছাড়া সাফ উইমেন্স ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপও জিতেছেন। তাঁর নেতৃত্বেই ইস্টবেঙ্গল প্রথম ভারতীয় ক্লাব হিসেবে এএফসি উইমেন্স চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গ্রুপ পর্বে টানা দুবার জায়গা করে নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলের গতি ও তীব্রতা সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি সচেতন। তাই প্রস্তুতিতে কোনো খামতি রাখেননি। তাঁর কথায়, “আমাদের মেয়েরা এই মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করতে প্রস্তুত। এশিয়ার এই শক্তিশালী দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে।”

সমর্থকদের প্রতি অনুরোধ: গ্যালারি ভরানোর আহ্বান

শেষে, সমর্থকদের জন্য সাথী আর কোচ দু’জনের খাসা অনুরোধ—সবাই গ্যালারিতে এসে দলকে হেঁক দেবেন যেন। ঘরের মাঠে সমর্থকদের আওয়াজ হলে খেলোয়াড়দের লড়াই করার ইচ্ছে আলাদা রকম হয়, জানালেন দু'জনেই।

সাথী বলেছেন, “কিশোরভারতীতে আমাদের সমর্থকরা এলে খেলায় আলাদা energía আসবে। আমরা তাদের সামনেই জয়ের শুরু করতে চাই।” কোচ অ্যান্ড্রুজও সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “এই ম্যাচটি শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং ভারতীয় মহিলা ফুটবলের জন্য একটি বড় সুযোগ। সবাই এসে দলকে সমর্থন করুন।”

এখন দেখার, এই প্রথম ম্যাচ থেকে জয়ের স্বাদ নিতে পারে কি না ইস্টবেঙ্গলের মেয়েরা।