সিঁদুরদানের ছবি আর ‘আমি জানতাম তুই পারবি’
কয়েক মাস যেতে না যেতে, এবার সরাসরি বিয়ের পিঁড়িতে বসে গেলেন উপাসনা ঘোষাল। পাত্র তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমিক সৌনক। সিঁদুরদানের ছবিটা নিজেই পোস্ট করলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। ক্যাপশনে লিখলেন, “আমি জানতাম তুই পারবি।” এই একটি লাইনেই যেন লুকিয়ে ছিল বহু বছরের সম্পর্কের গল্প—অনেক উত্থান-পতন, অনেক বিতর্ক, আর তারপরেও একে অপরকে ধরে রাখার বিশ্বাস।
ছবিতে দেখা গেছে, নববধূর সাজে উপাসনাকে। লাল-সোনালি শাড়ি, সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে গাঁথা ফুলের মালা। পাশে সৌনক। ক্যামেরার সামনে দুজনের মুখে যে হাসি, সেটা অভিনয়ের নয়—একেবারে স্বাভাবিক, একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় দিনের হাসি।
বাংলা সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ছবি ছড়িয়ে পড়তেই অনেকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। অনেকে লিখেছেন, বহুদিনের সম্পর্ক শেষমেশ পূর্ণতা পেল। কিন্তু সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে আরেকটি অধ্যায়—কটাক্ষের।
‘অন্তঃসত্ত্বা বলে বিয়ে’ — কটাক্ষের বন্যা
সিঁদুরদানের ছবি পোস্ট করার পরেই শুরু হয় কটাক্ষের বন্যা। অনেকেই বলেছেন, “অন্তঃসত্ত্বা বলেই বিয়ে!” কেউ কেউ ধরেই নিয়েছেন, “বৈশাখেই ঘরে আসবে নতুন অতিথি।” কারও মন্তব্য, “অন্তঃসত্ত্বা বলেই কার্তিক মাসে বিয়ে?”
এই ধরনের মন্তব্যের পিছনে কোনো প্রমাণ নেই। উপাসনা বা সৌনক—দুজনেই এখনও পর্যন্ত এই নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়মই হলো—একটি ছবি দেখে অনেকে নিজের মতো করে গল্প বানিয়ে নেন। বিশেষ করে যখন কেউ আগে বিতর্কিত ভিডিও করেছেন, তখন তাঁর যেকোনো ভালো খবরও সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
এখানেই একটি বড় অস্বস্তিকর সত্যি লুকিয়ে আছে। একজন মানুষ যদি অতীতে ‘বোল্ড’ কনটেন্ট করেন, তাহলে তাঁর বিয়ে, সন্তান বা ব্যক্তিগত জীবনের যেকোনো সিদ্ধান্তকে অনেকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেন না। তাঁর জীবনের প্রতিটি ঘটনাকে ‘কৌশল’ বা ‘লুকোনো কারণ’-এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। উপাসনার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে।
কার্তিক মাসে বিয়ে: শাস্ত্র কী বলে?
এই বিতর্কের আরেকটি দিক—কার্তিক মাসে বিয়ে। অনেকেই কমেন্টে প্রশ্ন তুলেছেন, কার্তিক মাসে বিয়ে কি শুভ? হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী এই মাসে বিয়ে হয়, তবে এই মাসে বিয়ে শুভ বলে আলাদা করে উল্লেখ নেই। তাই অনেকেই চেষ্টা করেন এই মাসটাকে এড়িয়ে যেতে। তবে কার্তিকে বিয়েতে সে অর্থে কোনো বাধা নেই বলেই জানা যাচ্ছে।
প্রশ্নটা আসলে ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়ে বেশি করে সামাজিক রীতিনীতির। বহু পরিবারে চaturmas অর্থাৎ আষাঢ় থেকে কার্তিক পর্যন্ত শুভকাজ বন্ধ থাকে। কিন্তু সেই নিয়ম সব জায়গায় সমানভাবে মানা হয় না। বিশেষ করে শহুরে পরিবারে বা আধুনিক জুটির ক্ষেত্রে এই নিয়ম অনেক সময়ই মানা হয় না।
উপাসনা-সৌনকের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। তাঁরা যে কারণেই বিয়ে করুন না কেন, সেটা তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় এই সিদ্ধান্তও হয়ে গেছে আলোচনার বিষয়। কেউ বলছেন ‘শুভ নয়’, কেউ বলছেন ‘কোনো বাধা নেই’—আর এই আলোচনার মধ্যেই হারিয়ে যাচ্ছে আসল ঘটনা, অর্থাৎ দুজনের বিয়ে।
ভাইরাল ভিডিও থেকে জ্যোতিষশাস্ত্র: বদলে যাওয়া উপাসনা
উপাসনা ঘোষালের যাত্রাটা সত্যিই অসাধারণ। কয়েক মাস আগেও তিনি ছিলেন ‘হট’ লুকের ইনফ্লুয়েঞ্জার। তাঁর বেশিরভাগ ভিডিও ছিল লাইফস্টাইল ভ্লগ—কখনও জিমের ভিডিও, কখনও বন্ধ ঘরে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত। সেই ভিডিওগুলো নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। কমেন্ট বক্স ভরে যেত আপত্তিকর মেসেজে। কিন্তু তাতে কোনোদিনই গুরুত্ব দেননি যুগল। বরং আরও বেশি করে বিতর্কিত ভিডিও-ছবি পোস্ট করেছেন। অনেকেই বলেছেন, আসলে যত বেশি বিতর্ক তত ভিউ, তত আয়।
তারপর আচমকাই ভোলবদল। ‘হট’ লুক বদলে রাতারাতি একেবারে নিপাট বাঙালি মেয়ের রূপে ধরা দিতে শুরু করেন উপাসনা। স্বাভাবিকভাবেই নেটদুনিয়ার মনে প্রশ্ন জাগে—কেন এই ভোলবদল?
উত্তরটা লুকিয়ে ছিল তাঁর নতুন কাজে। গত কয়েক মাসে উপাসনার জীবনে এসেছে বড় পরিবর্তন। তিনি জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছেন। তৈরি করেছেন নিজের টিম। স্বাভাবিকভাবেই বদলে ফেলেছেন পোশাকও। এখন তাঁকে দেখা যায় শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজে, কপালে ছোট টিপ, হাতে রত্নের ব্রেসলেট।
এই পরিবর্তন কেউ স্বাগত জানিয়েছেন, কেউ আবার কটাক্ষ করেছেন। কেউ বলেছেন, এটি নতুন কনটেন্টের কৌশল। কেউ বলেছেন, মানুষ বদলায়—এটা স্বাভাবিক। তবে যেটাই হোক, একটি বিষয় মেনে নিতে হবে—উপাসনা তাঁর ব্র্যান্ডকে নতুনভাবে তৈরি করতে পেরেছেন, যা অনেক ইনফ্লুয়েঞ্জার পারেন না।
উপাসনা ঘোষাল কে? কল্যাণী থেকে ইন্টারনেট তারকা
উপাসনা ঘোষালের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের কল্যাণীতে। ফেসবুক, ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রাম—তিনটি প্ল্যাটফর্মেই তিনি সমানভাবে পরিচিত। ইনস্টাগ্রামে তাঁর ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লক্ষের কাছাকাছি। এই বিপুল সংখ্যক ফলোয়ারই তাঁর প্রধান শক্তি।
তবে এই পরিচিতি যে সবসময় ইতিবাচক ছিল, তা নয়। অনেকেই তাঁকে চেনেন ‘বিতর্কিত ভিডিও’র মাধ্যমে। কিন্তু সত্যি বলতে, উপাসনার কনটেন্ট কখনও শুধু ‘বোল্ড’ ছিল না। তাঁর ভ্লগে দৈনন্দিন জীবন, রান্না, জিম, ভ্রমণ—সবই ছিল। শুধু কিছু নির্দিষ্ট ভিডিও বেশি নজর কেড়েছিল, আর সেগুলোই তাঁকে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিল।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের গোটা কেরিয়ার অনেক সময় একটি ভিডিওর ওপর নির্ভর করে বিচার হয়ে যায়। উপাসনার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাঁর শতাধিক ভিডিওর মধ্যে কিছু ভিডিও তাঁকে ‘ভাইরাল’ করেছে, কিন্তু সেই ভাইরালিটাই তাঁকে ‘বিতর্কিত’ পরিচয় দিয়েছে।
রত্ন-ব্রেসলেট, গণেশ পুজো ও ‘জ্যোতিষী’ কটাক্ষ
জ্যোতিষশাস্ত্রে আসার পর উপাসনার কাজের ধরনও বদলেছে। এখন তিনি ভাগ্য ফেরাতে চাওয়া মানুষদের কাছে ব্রেসলেট, গ্রহরত্ন ইত্যাদি বিক্রি করেন। তাঁর নতুন ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, কীভাবে রত্ন বা মন্ত্র ভাগ্য বদলাতে সাহায্য করে।
কিন্তু এই নতুন পেশাও কটাক্ষ থেকে রক্ষা পায়নি। সম্প্রতি সোশাল মিডিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উপাসনার গণেশপুজো সংক্রান্ত একটি ভিডিও। সেখানে তিনি বলেছেন, এই দিনে কী কী করলে ফিরবে সৌভাগ্য। সেই ভিডিওতে একজন লিখেছেন, “এ যদি জ্যোতিষী হয় তাহলে আমি মহাকাশচারী।” কেউ আবার খোঁচা দিয়ে লিখেছেন, “ভাগ্যিস আমি জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করি না।”
এই কটাক্ষের পিছনে দুটি ভিন্ন মনোভাব কাজ করছে। একটি হলো—যে ব্যক্তি আগে ‘হট’ কনটেন্ট করতেন, তিনি হঠাৎ জ্যোতিষী হলেন কীভাবে? দ্বিতীয়টি হলো—জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে সাধারণভাবে থাকা সংশয়। দুটোই আলাদা বিষয়, কিন্তু উপাসনার ক্ষেত্রে দুটো একসঙ্গে এসেছে।
তবে একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না—অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা সত্যিই বিশ্বাস করেন এবং তাঁর কাছ থেকে রত্ন কিনে উপকৃত হয়েছেন বলে দাবি করেন। সেই সংখ্যাটাও কম নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় কটাক্ষকারীরা বেশি শব্দ করেন, কিন্তু সন্তুষ্ট গ্রাহকেরা সাধারণত চুপ থাকেন।
ইনফ্লুয়েঞ্জার অর্থনীতি: ভাইরালিটি কেন এত দামি
উপাসনার ঘটনা আসলে বড় একটি প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে—ইনফ্লুয়েঞ্জার অর্থনীতিতে ভাইরালিটি কেন এত দামি?
ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম থেকে মোটা টাকা আয় হয়। ফলে এখন হাতে স্মার্টফোন থাকলে সকলেই কনটেন্ট ক্রিয়েটর হতে চান। কিন্তু এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ভিউ দরকার, আর ভিউ পেতে হলে মানুষকে থামাতে হবে। সেই থামানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো—বিতর্ক।
এই কারণেই অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্কিত কনটেন্ট বানান। তাঁরা জানেন, কমেন্ট বক্সে যত গালি পড়বে, অ্যালগরিদম তত বেশি ভিডিও প্রমোট করবে। ফলে ‘নেগেটিভ এনগেজমেন্ট’ও অনেক সময় পজিটিভ এনগেজমেন্টের মতোই কাজ করে।
উপাসনা নিজে এই কৌশল ব্যবহার করেছেন কি না, সেটা তিনি ছাড়া কেউ বলতে পারবে না। তবে তাঁর কনটেন্ট যাত্রা দেখে এটা স্পষ্ট—তিনি জানেন কীভাবে নজর কাড়তে হয়। আর সেই জ্ঞানই তাঁকে আজ এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।
মহিলা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর ট্রলিং: একটি বড় প্রশ্ন
উপাসনার বিয়ের খবরে যে ধরনের কটাক্ষ এসেছে, তা নিছক ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এটি আসলে মহিলা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর চলা এক ধরনের সামাজিক নজরদারির প্রতিচ্ছবি।
একজন পুরুষ ইনফ্লুয়েঞ্জার বিয়ে করলে তাঁকে শুভেচ্ছা জানানো হয়। কিন্তু একজন মহিলা ইনফ্লুয়েঞ্জার বিয়ে করলে প্রশ্ন ওঠে—‘কেন এত তাড়াতাড়ি?’, ‘অন্তঃসত্ত্বা নাকি?’, ‘কত টাকা পেল?’ এই দ্বৈত মানদণ্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব সাধারণ।
উপাসনার ক্ষেত্রে এই মানদণ্ড আরও কঠিন হয়েছে, কারণ তাঁর অতীতে ‘বোল্ড’ কনটেন্ট আছে। সমাজ যেন তাঁকে বারবার মনে করিয়ে দিতে চায়—তুমি একবার ‘ভুল’ করেছ, তাই তোমার জীবনের প্রতিটি ভালো সিদ্ধান্তও সন্দেহের চোখে দেখা হবে।
এটি মোটেই ন্যায্য নয়। একজন মানুষের অতীতের পেশাগত সিদ্ধান্ত এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্ত দুটো আলাদা। বিয়ে একটি পবিত্র সম্পর্ক। সেখানে ‘অন্তঃসত্ত্বা’ জাতীয় কটাক্ষ করা শুধু অশোভনই নয়, বরং একজন মহিলার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সামিল।
সামনে কী? দাম্পত্য ও কেরিয়ারের সমীকরণ
বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু উপাসনার জীবনে নতুন অধ্যায় এখনও শুরু হয়নি। এখন প্রশ্ন হলো—বিয়ের পর তিনি তাঁর কনটেন্ট কেরিয়ার চালিয়ে যাবেন কি না, এবং কীভাবে চালাবেন।
জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে তাঁর কাজ যে থেমে যাবে না, সেটা তিনি ইতিমধ্যেই বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাঁর টিম আছে, গ্রাহক আছেন, এবং একটি নতুন পরিচয় তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি লাইফস্টাইল কনটেন্টও তিনি চালিয়ে যেতে পারেন—তাতে কোনো বাধা নেই।
আর সবচেয়ে বড় কথা, কটাক্ষকারীরা যাই বলুক, বিয়েটা তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত। সৌনকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বহু বছরের। সেই সম্পর্ক যদি বিয়ের পিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছায়, তাহলে সেটা উদযাপনের বিষয়, কটাক্ষের নয়।
আপাতত ভক্তদের একটাই চাওয়া—নবদম্পতির সুখী Married Life, এবং উপাসনার নতুন কাজগুলোতে আরও সাফল্য। আর নেটিজেনদের জন্য একটি অনুরোধ—একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে ঢুকে পড়ার আগে একটু ভেবে দেখুন, সেই কথাগুলো যদি আপনার নিজের বোন বা মেয়ের সম্পর্কে বলা হয়, তাহলে কেমন লাগবে।