কী ঘটল শিয়ালদহে? সকালবেলার হানার সম্পূর্ণ বিবরণ
শনিবার সকালে শিয়ালদহ এনআরএস হাসপাতালের সামনের ফুটপাতে রাজুদার পকেট পরোটার দোকানে আচমকা হানা দেন কলকাতা পুরসভার খাদ্য সুরক্ষা বিভাগের আধিকারিকরা। ভাইরাল এই পরোটা বিক্রেতার দোকানে এত সকালে হানা হবে—সেটা তিনিও ভাবতে পারেননি। আধিকারিকদের প্রথম অভিযোগ ছিল সরাসরি এবং স্পষ্ট: রাজুদার কাছে পরোটা বিক্রির কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। এই অভিযোগেই শুরু হয় পুরো তদন্ত।
আধিকারিকরা শুধু কাগজপত্র দেখেই থেমে যাননি। তাঁরা রাসায়নিক দিয়ে খাবারের গুণগত মান পরীক্ষা করেন। রাজুদার তৈরি তরকারি ফ্লোর টেস্টে পাশ করে যায়। এই খবর শুনে রাজুদা বেশ খুশি হয়েছিলেন। এরপর ল্যাব টেস্টের জন্য খাবারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। রিপোর্ট আসতে এখনও সাত দিন বাকি।
শুধু তাই নয়, রাজুদাকে এখন থেকে সার্জিক্যাল ক্যাপ পড়ে দোকানে দাঁড়াতে হবে এবং গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। এই নির্দেশও দেওয়া হয়েছে আধিকারিকদের তরফে। অর্থাৎ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাবার পরিবেশন করতে হবে—সেটা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
লাইসেন্স ছিল না—এই অভিযোগই সবচেয়ে বড়
খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা যখন রাজুদার কাছে পরোটা বিক্রির লাইসেন্স চান, তখন তিনি কোনো লাইসেন্স দেখাতে পারেননি। রাজুদা নিজেই স্বীকার করেছেন, লাইসেন্সের বিষয়টা তিনি জানতেনই না। তাঁর দাবি, “বাড়িতে ১০-১২ কেজি ময়দার পরোটা বানাই। ৩টে ৪৫-এর ট্রেন ধরে কলকাতায় এসে বিক্রি করি। সকাল ১১টায় আবার ফিরে যাই। স্যাররা বললেন, এবার লাইসেন্স নিতে হবে। আমি চেষ্টা করব নিশ্চয়।”
এই ঘটনা শুধু রাজুদার ক্ষেত্রেই নয়, বরং সমস্ত স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। অনেক ছোট দোকানদারই জানেন না যে খাদ্য বিক্রি করতে হলে নির্দিষ্ট লাইসেন্স বা রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজন। খাদ্য সুরক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, যে কেউ খাদ্য প্রস্তুত, বিক্রি বা পরিবেশন করেন, তাঁকে নিবন্ধন বা লাইসেন্স নিতে হয়। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য FSSAI-র বেসিক রেজিস্ট্রেশন এবং বড় ব্যবসার জন্য স্টেট বা সেন্ট্রাল লাইসেন্স বাধ্যতামূলক।
রাজুদার ক্ষেত্রে লাইসেন্স না থাকা একটি প্রক্রিয়াগত ত্রুটি। তবে তাঁর খাবারের গুণমান নিয়ে অভিযোগ ওঠেনি—এটাই তাঁর জন্য স্বস্তির। তিনি নিজেই বলেছেন, “আমার খাবার নিয়ে কেউ অভিযোগ তুলতে পারবে না।” এই আত্মবিশ্বাসই তাঁর জনপ্রিয়তার মূল কারণ। কিন্তু লাইসেন্স না থাকলে ভবিষ্যতে আইনি ঝামেলা তৈরি হতে পারে। তাই আধিকারিকদের পরামর্শ—যত দ্রুত সম্ভব লাইসেন্সের ব্যবস্থা করা।
ফ্লোর টেস্টে তরকারি পাশ, ল্যাব রিপোর্টের অপেক্ষা ৭ দিন
ফ্লোর টেস্ট বা তাৎক্ষণিক পরীক্ষায় রাজুদার তরকারি পাশ করেছে—এটি তাঁর খাবারের মানের পক্ষে একটি ইতিবাচক সংকেত। ফ্লোর টেস্ট সাধারণত খাবারে ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভেজাল বা পচন ধরেছে কি না, তা দ্রুত যাচাই করতে ব্যবহৃত হয়। রাজুদার ক্ষেত্রে সেই প্রাথমিক পরীক্ষায় কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি।
তবে ল্যাব টেস্ট আরও বিস্তারিত। এখানে খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে মাইক্রোবায়োলজিক্যাল এবং কেমিক্যাল বিশ্লেষণ করা হয়। এতে খাবারে ব্যাকটেরিয়া, ভারী ধাতু, ক্ষতিকর রঙ বা অন্যান্য দূষণ আছে কি না, তা ধরা পড়ে। রাজুদার নমুনার রিপোর্ট আসতে সাত দিন সময় লাগবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজুদা অবশ্য আশাবাদী। তিনি বলেছেন, “আমার খাবার নিয়ে কেউ অভিযোগ তুলতে পারবে না।” তাঁর এই আত্মবিশ্বাসের পিছনে কারণও আছে—বছরের পর বছর ধরে তিনি একই পদ্ধতিতে পরোটা বানিয়ে বিক্রি করছেন, এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ তা খেয়ে সন্তুষ্ট। তবে স্বাস্থ্যবিধির ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মানতে হবে—যেমন সার্জিক্যাল ক্যাপ, গ্লাভস, পরিষ্কার পরিবেশ। এই নির্দেশগুলো তিনি মেনে চলার আশ্বাস দিয়েছেন।
স্টেশন এলাকার অন্য দোকানেও হানা: ১০০টি সিঙারা-সহ পচা খাবার ফেলে দেওয়া
শুধু রাজুদার দোকান নয়, সেই সকালেই শিয়ালদহ স্টেশন লাগোয়া আরও কিছু দোকানে হানা দেয় খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। খাবারের নমুনা—সিঙারা, কচুরির তরকারি, মাছ, মাংস—তুলে নিয়ে কেমিক্যাল টেস্ট করা হয়। যেসব খাবার মানের পরীক্ষায় ফেল করেছে, সেগুলো সোজা মাঠে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, মোট ১০০টি সিঙারা, কচুরির ডাল, তরকারি, পচা চিকেন এবং মাছের ডিম আবর্জনায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। আধিকারিকরা জানিয়েছেন, গুণগত মান পরীক্ষায় এই খাবারগুলো উত্তীর্ণ হয়নি। তাই সেগুলো ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দোকানদারদেরও স্পষ্টভাবে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে—খাদ্যের মানে কোনো আপস চলবে না।
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, শিয়ালদহ স্টেশন এলাকার খাবারের মান নিয়ে দপ্তর কতটা কঠোর হয়েছে। স্টেশন এলাকা মানেই প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীর ভিড়। এই ভিড়ের মধ্যে খাবারের মান খারাপ হলে তা বড়公共卫生 ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এই ধরনের অভিযান নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
রাজুদার প্রতিক্রিয়া: “খাবার নিয়ে কেউ অভিযোগ তুলতে পারবে না”
হানার পর রাজুদা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, লাইসেন্সের বিষয়টি তিনি জানতেন না, তবে এখন তা নেওয়ার চেষ্টা করবেন। তাঁর কথায়, “লাইসেন্স ব্যাপারটা জানতামই না। বাড়িতে ১০-১২ কেজি পরোটা বানিয়ে, ৩টা ৪৫-এ ট্রেন ধরে কলকাতায় আসি, সকাল ১১টার মধ্যে বিক্রি শেষ করে আবার বাড়ি ফিরে যাই। আজ স্যাররা বলল, এবার লাইসেন্স নিতে হবে। আমি চেষ্টা করব নিশ্চয়। কিন্তু আমার খাবার নিয়ে কেউ অভিযোগ তুলতে পারবে না।”
তিনি আরও আশ্বাস দিয়েছেন, এবার থেকে সার্জিক্যাল ক্যাপ এবং গ্লাভস পড়েই দোকানে দাঁড়াবেন। এই প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, তিনি নিয়ম মেনে ব্যবসা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। তাঁর খাবারের গুণমান নিয়ে আপত্তি না ওঠায় সেটাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
এই ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজুদার সমর্থকরা তাঁকে পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনেকেই বলেছেন, রাজুদা বছরের পর বছর ধরে সৎভাবে ব্যবসা করছেন, হঠাৎ করে লাইসেন্সের অভিযোগে তাঁকে target করা ঠিক নয়। আবার কেউ কেউ বলেছেন, আইন সবার জন্য সমান। লাইসেন্স না থাকলে সেটা আইনি ত্রুটি, এবং তা সংশোধন করা উচিত।
রাজুদা কে? কীভাবে viral হলেন?
রাজুদা—পুরো নাম রাজু দাস—শিয়ালদহ স্টেশন এলাকার এক পরিচিত মুখ। এনআরএস হাসপাতালের সামনে ফুটপাতে তাঁর ছোট্ট দোকান। বিক্রি করেন পকেট পরোটা। এক প্লেটে তিনটি পরোটা, সঙ্গে আনলিমিটেড আলুর তরকারি, একটি ডিম এবং পেঁয়াজ—সব মিলিয়ে দাম মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকা। এই কম দামে এত খাবার—যে কোনো সাধারণ মানুষের কাছে এটি স্বপ্নের মতো।
২০২৪ সালের শেষের দিকে রাজুদার পকেট পরোটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। একের পর এক ফুড ব্লগার তাঁর দোকানে ভিড় জমাতে শুরু করেন। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, সকালবেলা রাজুদা কীভাবে পরোটা বানান, কীভাবে পরিবেশন করেন। তাঁর সরল ব্যবহার এবং কম দামে বেশি খাবার—এই দুটোই তাঁকে নেটপাড়ার প্রিয় করে তোলে।
ভাইরাল হওয়ার পর রাজুদার জীবন অনেকটাই বদলে যায়। তিনি বিভিন্ন টিভি শোতে আমন্ত্রণ পান। বিধায়ক মদন মিত্র থেকে জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ—সব জায়গায় তাঁকে দেখা যায়। ক্রিকেটার মেসির সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগও পান। ফেক অ্যাকাউন্টের সমস্যায় পড়তে হয়, এমনকি পুলিশে অভিযোগও করতে হয়। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে রাজুদা তাঁর সরল জীবনযাত্রা এবং খাবারের মান ধরে রেখেছেন।
খাদ্য সুরক্ষা আইন ও লাইসেন্সের নিয়ম: দোকানদারদের কী জানা উচিত
খাদ্য সুরক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, ভারতে যে কোনো খাদ্য ব্যবসায়ীকে FSSAI-র অধীনে নিবন্ধন বা লাইসেন্স নিতে হয়। ব্যবসার আকার অনুযায়ী এটি তিন ভাগে বিভক্ত—বেসিক রেজিস্ট্রেশন (ছোট ব্যবসা), স্টেট লাইসেন্স (মাঝারি ব্যবসা) এবং সেন্ট্রাল লাইসেন্স (বড় ব্যবসা)।
স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের অনেকেই এই নিয়ম সম্পর্কে অবগত নন। ফলে তাঁরা লাইসেন্স না নিয়েই ব্যবসা চালান। কিন্তু এই লাইসেন্স শুধু কাগজপত্রের বিষয় নয়—এটি খাদ্যের মান, পরিচ্ছন্নতা এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। লাইসেন্স থাকলে নির্দিষ্ট সময় অন্তর খাদ্য নিরাপত্তা পরীক্ষা হয়, এবং কোনো সমস্যা হলে তা দ্রুত ধরা পড়ে।
রাজুদার ক্ষেত্রে লাইসেন্স না থাকা একটি সতর্কবার্তা। তবে তাঁর খাবারের মান ভালো—এটাই তাঁর ভাগ্য। কিন্তু সব দোকানদারের ক্ষেত্রে এমন নাও হতে পারে। তাই খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের এই ধরনের অভিযান নিয়মিত হওয়া উচিত, যাতে ভোক্তারা নিরাপদ খাবার পান।
কেন এই হানা গুরুত্বপূর্ণ? স্ট্রিট ফুড ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন
কলকাতার স্ট্রিট ফুড সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। কিন্তু এই খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন বহুদিনের। অনেক সময় রাস্তার ধারের দোকানে পচা উপকরণ, অনিয়মিত পরিচ্ছন্নতা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি হয়। এই ধরনের খাবার খেয়ে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন—এমন ঘটনাও কম নয়।
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ কলকাতা পুরসভা শহরের 여러 রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানে অভিযান চালিয়ে ৪০টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করেছিল। সেখানে নর্দমার উপর রান্না, বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো হলুদ, ইঁদুর-আরশোলা-টিকটিকির উপস্থিতি—এমন ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে রাজুদার দোকানে হানা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
তবে একইসঙ্গে একটি প্রশ্নও ওঠে—কেন শুধু রাজুদা? শহরের আরও অনেক স্ট্রিট ফুড বিক্রেতা আছেন, যাঁদের লাইসেন্স নেই, পরিচ্ছন্নতার অভাব রয়েছে। সবার ক্ষেত্রে সমান কঠোরতা প্রয়োজন। তবেই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকবে।
সামনে কী? রাজুদার দোকানের ভবিষ্যৎ
আপাতত রাজুদার দোকান বন্ধ হয়নি। তিনি সার্জিক্যাল ক্যাপ এবং গ্লাভস পরে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ল্যাব রিপোর্ট আসতে সাত দিন সময় লাগবে। সেই রিপোর্টে যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে বড় কোনো acción হবে না। তবে লাইসেন্সের বিষয়টি নিয়ে তাঁকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাজুদা নিজেই বলেছেন, তিনি লাইসেন্স নেওয়ার চেষ্টা করবেন। এই ইচ্ছাটাই ইতিবাচক। তাঁর সমর্থকরা আশা করছেন, এই ঘটনা তাঁর জনপ্রিয়তাকে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। বরং এটি একটি শিক্ষণীয় ঘটনা হিসেবে থাকবে—যেখানে আইন মেনে ব্যবসা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা সবার সামনে তুলে ধরবে।
সব মিলিয়ে শিয়ালদহের এই হানা শুধু রাজুদার জন্য নয়, বরং সমস্ত স্ট্রিট ফুড বিক্রেতা এবং ভোক্তাদের জন্য একটি জরুরি বার্তা। খাবারের স্বাদ যতই ভালো হোক, নিরাপত্তা এবং আইনি বৈধতা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না।