Tarapith Kaushiki Amavasya 2026: তারাপীঠে দেবীর আরাধনায় উপোস নয়—জানুন কৌশিকী অমাবস্যার বিশেষ নিয়ম ও মাহাত্ম্য

৮ অগাস্ট, ২০২৬ লেখক: Deb Sarkar পড়তে ৮ মিনিট আধ্যাত্মিক
Tarapith Kaushiki Amavasya 2026

তারাপীঠে দেবীর আরাধনায় উপোস একেবারেই চলে না—এই নিয়ম অনেকের অজানা। সনাতন ধর্মে সাধারণত উপোস রেখে পুজো দেওয়া রীতি, কিন্তু বীরভূমের তারাপীঠে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। এখানে খালি পেটে ঠাকুরের সামনে যাওয়া মানা।

ভাদ্র মাসের গভীর অন্ধকারে, কৌশিকী অমাবস্যার রাতে তারাপীঠে শুরু হয় বিশেষ জাগরণ। ভক্তরা বিশ্বাস করে এই রাতে মা তারার দ্বারে গেলে কেউ খালি হাতে ফেরে না। ২০২৬ সালে কৌশিকী অমাবস্যা পড়েছে ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার—তিথির শুরু সন্ধ্যা থেকে, শেষ হয় পরদিন সকাল পর্যন্ত। পুজো দিতে ভিড়ও চলে রাতভর।

আর এই সময় পুরোনো একটা কঠিন নিয়ম মেনে চলতে হয়—খালি পেটে তারাপীঠে পুজো দেওয়া একদম নিষেধ

কৌশিকী অমাবস্যা ২০২৬ – পুজোর সময় ও আচার-নিয়ম জানুন

নিচে আপনার ইচ্ছা নির্বাচন করুন। টুলটি জানিয়ে দেবে কৌশিকী অমাবস্যার পুজোর সময়, মন্ত্র ও করণীয়।

কৌশিকী অমাবস্যা
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
🕉️ মা তারা পুজো
তিথি শুরু
১০ সেপ্টেম্বর, সকাল ১০:০১
তিথি শেষ
১১ সেপ্টেম্বর, সকাল ৮:৫০
শ্রেষ্ঠ পুজোর সময়
আপনার উদ্দেশ্য

🙏 পুজোর আচার-নিয়ম

🔱 মা তারার মন্ত্র

ॐ হ্রীং স্ত্রীং হুঁ ফট্ স্বাহা

এই মন্ত্রটি ১০৮ বার জপ করুন। লাল আসনে বসে ধ্যান করুন।

এই তথ্য পঞ্জিকা ও তন্ত্রশাস্ত্রের ভিত্তিতে তৈরি। চূড়ান্ত পুজোর সময় স্থানীয় পঞ্জিকা দেখে নিন।

কেন তারাপীঠে উপোস নিষেধ?

তন্ত্র মতে, কৌশিকী অমাবস্যার রাত মানেই 'তারারাত্রি'—শক্তির দোলাচল থাকে চরমে। ভক্তরা লম্বা লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়ান। এদিকে খালি পেটে থাকলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, মনও ক্লান্ত হয়ে যায়। তখন শ্মশানভূমির নেতিবাচক শক্তি সহজেই কাবু করতে পারে। সাধু-সন্ন্যাসীরাও বলেন, শরীর আর মনকে সব সময় জাগিয়ে রাখতে পুজোর আগে প্রসাদ খাওয়া জরুরি।

তারাপীঠ শুধু শিবজায়া তারার স্থান নয়, এখানে মা আনন্দময়ী। এই কৌশিকী অমাবস্যার রাতে শ্বেতশিমূল গাছের নিচে সাধনা করে সাধক বামাক্ষ্যাপা সিদ্ধিলাভ করেছিলেন; মা দেখা দিয়েছিলেন করুণাময়ী রূপে। তখন থেকেই এই দিন দেবী 'রাজবেশে' আবির্ভূত হন।

তন্ত্রশাস্ত্রে মায়ের ভয়ংকরী রূপের কথা থাকলেও, তিনি আবার অন্নপূর্ণা—পরম মমতাময়ী মা। কেউ চায় না নিজের সন্তান অনাহারে থাকুক। তাই এখানে পেট ভরে ভোগ বা প্রসাদ খেয়ে তবেই মায়ের পায়ে মাথা ঠোকা পুরোনো প্রথা। ভক্তিভরে প্রসাদ নিলে আর 'জয় তারা' জপ করলে, জীবনের সব বাধা-অশুভ কেটে যায়—এই বিশ্বাস আজও সমান শক্তিশালী।

২০২৬ সালে কৌশিকী অমাবস্যা পড়েছে ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার। এই দিনটার মাহাত্ম্য অন্যান্য অমাবস্যার থেকে আলাদা। শাস্ত্রে তো কৌশিকী অমাবস্যাকে সবচেয়ে পবিত্র বলা হয়—শক্ত-তন্ত্র সাধকদের কাছে বিশেষ এক রাত।

কৌশিকী অমাবস্যার পুরাণ কাহিনি

📖 শুম্ভ-নিশুম্ভের কাহিনি

শুম্ভ-নিশুম্ভ নামে দু'জন অসুরের অত্যাচারে দেবতারা দিশেহারা হয়ে পড়েন। তখন মা পার্বতী নিজের শরীরের কালো কোষিকা ফেলে 'কৌশিকী' রূপে অবতীর্ণ হন। এই রূপেই পরে তিনি চামুণ্ডা বা মা তারা হয়ে অসুরদের বধ করেন। এই কাহিনি ঠিক ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যায় হয়েছিল বলে, সেই অমাবস্যার নামই কৌশিকী অমাবস্যা

এদিন মূলত মা তারার পুজো হয়। দশমহাবিদ্যার মধ্যে মা তারা দ্বিতীয়, আর তন্ত্র মতে তিনি "নীল সরস্বতী" নামে বিখ্যাত। প্রচলিত, এই রাতেই সাধক বশিষ্ঠ মুনি তারাপীঠের শ্মশানে মা তারার দর্শন পেয়েছিলেন। তাই তারাপীঠে কৌশিকী অমাবস্যার গুরুত্ব বেশিই।

তিথির হিসেব ও পুজোর সময়

অমাবস্যা তিথি শুরু হচ্ছে ১০ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা ১ মিনিটে, শেষ হচ্ছে ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে।

পুজোর সময়? এই অমাবস্যার রাত—তারা রাত্রি বলেই খ্যাত। রাত ১২টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত সময়টা সাধনা, পুজো, জপ, হোমের জন্য শ্রেষ্ঠ। বিশ্বাস আছে, এই রাতে মা তারা খুব দ্রুত সাড়া দেন।

তারাপীঠে এদিনটার গুরুত্ব আলাদা। সকাল থেকেই বিশেষ পুজো শুরু হবে, রাতে মহাহোম, মহাযজ্ঞ আর নিশি-আরতি। সাধু-সন্ন্যাসীরা রাতভর সাধনা করেন। যারা সেখানে যেতে পারেন না, বাড়িতে লাল আসনে মা তারার ছবি রেখে জপ-ধ্যান করাও চলে।

কৌশিকী অমাবস্যার মাহাত্ম্য

  • পিতৃদোষ-গ্রহদোষ কাটে: এই দিন পুজো করলে পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ পাওয়া যায় এবং গ্রহদোষ দূর হয়।
  • তন্ত্রসাধনার জন্য 'সিদ্ধ রাত্রি': তন্ত্রসাধকদের কাছে এই রাত অত্যন্ত শক্তিশালী। সাধনা করলে দ্রুত সিদ্ধি লাভ হয়।
  • দান-ধ্যানে অক্ষয় পুণ্য: এই দিন দান করলে বা ধ্যান করলে তার ফল অক্ষয় হয়।
  • ইচ্ছা পূরণ ও বাধা দূর: মা তারার কাছে প্রার্থনা করলে সমস্ত বাধা-অশুভ দূর হয় এবং মনোবাসনা পূর্ণ হয়।

সত্যি, কৌশিকী অমাবস্যা শুধু একটা তিথি নয়—এটা অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক। তাই একদম মন খুলে মা তারার কাছে ডাকে, সাধনা করে দেখুন।

তারাপীঠে কৌশিকী অমাবস্যায় কী করবেন?

আপনি যদি তারাপীঠে যেতে পারেন, তাহলে এই কাজগুলো করুন:

  • প্রসাদ গ্রহণ করে মন্দিরে প্রবেশ করুন – খালি পেটে যাবেন না।
  • লাল বস্ত্র পরিধান করুন – মা তারার প্রিয় রং লাল।
  • শ্বেতশিমূল গাছের নিচে প্রদক্ষিণ করুন – এই গাছের নিচেই বামাক্ষ্যাপা সিদ্ধি লাভ করেছিলেন।
  • মা তারার মন্ত্র জপ করুন – "ॐ হ্রীং স্ত্রীং হুঁ ফট্ স্বাহা" অথবা "জয় তারা" বলুন।
  • রাতভর জাগরণ করুন – নিশি-আরতিতে অংশ নিন।
  • দান করুন – গরিব-দুঃখীদের মধ্যে খাবার বা অর্থ দান করুন।

বাড়িতে কীভাবে পুজো করবেন?

যারা তারাপীঠে যেতে পারছেন না, তাঁরা বাড়িতেই এই নিয়মে পুজো করতে পারেন:

  • লাল আসনে মা তারার ছবি স্থাপন করুন।
  • লাল ফুলবেলপাতা দিয়ে পুজো করুন।
  • মা তারার মন্ত্র ১০৮ বার জপ করুন।
  • প্রসাদ হিসেবে খিচুড়ি বা পায়েস নিবেদন করুন।
  • গভীর রাতে ধ্যান করুন এবং মায়ের কাছে প্রার্থনা করুন।
  • পরদিন সকালে গরিবদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করুন।

সতর্কতা: তারাপীঠে কখনোই খালি পেটে পুজো দিতে যাবেন না। এটা শাস্ত্রসম্মত নয় এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিকর। প্রসাদ খেয়ে, পেট ভরে ঠাকুরের দর্শন করুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: কৌশিকী অমাবস্যা কবে পড়ছে?

২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার কৌশিকী অমাবস্যা পড়ছে। তিথি শুরু সকাল ১০:০১ মিনিটে, শেষ ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮:৫০ মিনিটে।

প্রশ্ন ২: তারাপীঠে কেন উপোস করা নিষেধ?

তন্ত্র মতে, কৌশিকী অমাবস্যার রাতে শক্তির দোলাচল চরমে থাকে। খালি পেটে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নেতিবাচক শক্তি আক্রমণ করতে পারে। তাই পুজোর আগে প্রসাদ খাওয়া আবশ্যক।

প্রশ্ন ৩: কৌশিকী অমাবস্যার পুজোর শ্রেষ্ঠ সময় কখন?

রাত ১২টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত সময়টি শ্রেষ্ঠ। এই সময়কে 'তারারাত্রি' বলা হয় এবং মা তারা খুব দ্রুত সাড়া দেন।

প্রশ্ন ৪: বাড়িতে কীভাবে কৌশিকী অমাবস্যার পুজো করব?

লাল আসনে মা তারার ছবি রেখে, লাল ফুল ও বেলপাতা দিয়ে পুজো করুন। "ॐ হ্রীং স্ত্রীং হুঁ ফট্ স্বাহা" মন্ত্র ১০৮ বার জপ করুন এবং খিচুড়ি বা পায়েস নিবেদন করুন।

প্রশ্ন ৫: কৌশিকী অমাবস্যায় কী কী দান করবেন?

গরিব-দুঃখীদের মধ্যে খাবার, অর্থ, বস্ত্র দান করুন। বিশেষ করে কালো তিল, লবণ, চিনি দান করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

প্রশ্ন ৬: কৌশিকী অমাবস্যার মাহাত্ম্য কী?

এই দিন পুজো করলে পিতৃদোষ-গ্রহদোষ কাটে, তন্ত্রসাধনায় সিদ্ধি আসে, দান-ধ্যানে অক্ষয় পুণ্য হয় এবং ইচ্ছা পূরণ হয়।

প্রশ্ন ৭: মা তারার মন্ত্র কী?

মা তারার মূল মন্ত্র: "ॐ হ্রীং স্ত্রীং হুঁ ফট্ স্বাহা"। এছাড়া "জয় তারা" বলেও ডাকতে পারেন।

প্রশ্ন ৮: কৌশিকী অমাবস্যায় কী কী নিষেধ?

খালি পেটে পুজো দেওয়া নিষেধ। এছাড়া অশুদ্ধ মন ও শরীর নিয়ে পুজো করা, অহংকার করা এবং মিথ্যা বলা নিষেধ।

প্রশ্ন ৯: বামাক্ষ্যাপা কে ছিলেন?

বামাক্ষ্যাপা ছিলেন তারাপীঠের এক মহান তান্ত্রিক সাধক। তিনি কৌশিকী অমাবস্যার রাতে শ্বেতশিমূল গাছের নিচে সাধনা করে মা তারার দর্শন লাভ করেছিলেন।

প্রশ্ন ১০: কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠে কীভাবে যাব?

তারাপীঠ বীরভূম জেলায় অবস্থিত। রামপুরহাট রেলস্টেশন থেকে বাস বা ট্যাক্সে তারাপীঠ যাওয়া যায়। অথবা কোলকাতা থেকে সরাসরি বাস সার্ভিস রয়েছে।

শেষ কথা: তারাপীঠের কৌশিকী অমাবস্যা এক অনন্য আধ্যাত্মিক সুযোগ। মা তারা অত্যন্ত করুণাময়ী—যে তাঁর কাছে প্রকৃত ভক্তি নিয়ে যায়, তিনি তাঁকে কখনো খালি হাতে ফেরান না। তবে এই নিয়মটা কখনো ভুলবেন না—পেট ভরে প্রসাদ খেয়ে তবেই মায়ের পায়ে মাথা ঠোকবেন। মা তারার আশীর্বাদ আপনার জীবনকে আলোকিত করুক।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

শেয়ার বাটনে ক্লিক করলেই সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট শেয়ার হবে।

Deb Sarkar

লেখক: Deb Sarkar

Deb Sarkar পশ্চিমবঙ্গের সরকারি প্রকল্প, কেন্দ্রীয় সরকারি স্কিম, শিক্ষা ও ডিজিটাল পরিষেবা বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। তিনি বিভিন্ন সরকারি বিজ্ঞপ্তি, অফিসিয়াল পোর্টাল এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করে পাঠকদের কাছে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন। সনাতন ধর্ম, তন্ত্রসাধনা ও আধ্যাত্মিকতা বিষয়েও তাঁর গভীর আগ্রহ রয়েছে।

✓ Fact Checked Content ✓ Spiritual Researcher ✓ Cultural Enthusiast