রাখি নিয়ে তখনকার ছেলেদের ভয় ছিল বেশ কাণ্ডকারখানা—৯০-এর দশকের কলকাতার স্মৃতি
রাখি নিয়ে তখনকার ছেলেদের ভয় ছিল বেশ কাণ্ডকারখানা এক জিনিস। নব্বইয়ের শুরুতে কলেজে রাখি দিবস এলেই ছেলেদের মধ্যে হুলস্থুল পড়ে যেত। কলকাতার বিখ্যাত কো-এড কলেজ, পড়াশোনা ছাড়াও ট্রেন্ড সেট করার জন্য নামডাক—ওই কলেজে রাখির দিন মানেই দুশ্চিন্তার দিন। সে সময় কলেজের ছেলেরা ক্যাম্পাসে রাখির ভয়ে আনচান করে ঘুরতো।
কেউ কেউ সেই দিন কলেজ আসাটাই এড়িয়ে যেত, অনেকে আবার মেয়েদের থেকে দূরে থাকত। কেউ কেউ লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে গা ঢাকা দিত—নিউ এম্পায়ার কিংবা লাইট হাউসের কোনায় বসে কাটিয়ে দিত দিনটা। খুব মজার বা আনন্দের সময় ছিল না এগুলো সত্যি বলতে।
‘প্রেমের রজধানী’ বলে কলকাতার এই কলেজের নাম যতই থাক, সেখানে রাখি ছিল একেবারে টানাটানির অস্ত্র। কার কে সঙ্গে জড়াবে, কার প্রস্তাব কে নেবে, কে ফিরিয়ে দেবে—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত রসায়ন চলত।
পাঁচ টাকার রাখির কাহিনী
শুভব্রত চক্রবর্তী তখন সেখানেই পড়তেন। প্রথম বছরেই প্রেমে পড়েছিলেন, প্রেমও পেয়েছিলেন। কিন্তু বছর কাটতে না কাটতেই সম্পর্ক জমেনি। কে আগে সরে যাবে, নিজেরা ঠিক ভেবে উঠতে পারেনি। শেষে মেয়েটি একদিন বৃষ্টিভেজা রাখি দিবসে শুভব্রতর হাতে রাখি পরিয়ে দিল। কলেজজুড়ে এই খবরটা ছড়িয়ে গেল।
এখন শুভব্রতের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি খোলাখুলি বলেন, “সেই পাঁচ টাকার রাখিই আমাকে বাঁচাল। সম্পর্কটা যদি টেনে নিয়ে যেতাম, ভয়ঙ্কর গণ্ডগোল হতো। রাখি আসলে আমাকে আর ওকেও রক্ষা করেছিল।” রাখিবন্ধনের অর্থ যে কেবল সম্পর্ক নয়, রক্ষাকল্যাণ, শুভব্রত সেটা মজা করেই বুঝিয়ে দেন।
শুভব্রতর স্মৃতি: “সেই পাঁচ টাকার রাখিই আমাকে বাঁচাল। সম্পর্কটা যদি টেনে নিয়ে যেতাম, ভয়ঙ্কর গণ্ডগোল হতো। রাখি আসলে আমাকে আর ওকেও রক্ষা করেছিল।”
‘তোকে ভাই বানালাম’—বন্ধুত্বের সেই অস্ত্র
এখানে রাখির জায়গা ছিল অনন্য। সরাসরি না বলে কাউকে ‘ভাই’ বানানোর সবচেয়ে সহজ রাস্তা ছিল হাতে রাখি পরিয়ে দেওয়া। দোকানে চার-পাঁচ টাকার রাখি কিনলেই কাজ শেষ। সেই রাখি যে পুরুষটিকে পড়ানো হল, সে ঠিক কোন বেদনায় পড়ল, সেটা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানত। কারও জীবনে ট্র্যাজেডি, কারও কাছে কমেডি।
তখনকার সময়ে 'তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব ঠিক আছে, কিন্তু সিরিয়াস কিছু শুরু করতে চাই না'—এই লাইনে ঝাড় খেতে খেতে বড় হয়ে গেছে একটা প্রজন্ম। কলেজের ক্যাম্পাস, কোচিং ফেরত মোড়, মফস্বলের গলিতে—সব জায়গাতেই প্রেমের প্রস্তাবে এই উত্তর শোনা যেত।
প্রত্যাখ্যানের শিল্প: এই ‘বন্ধুত্ব’-এর কথা মাঝখানে থেকে নরমিয়ে দিত ছাত্রহৃদয়। রাখির দিন আরও জম্পেশ হতো সেই কষ্ট। সন্ধ্যেবেলা গলির কুয়াশাভেজা বাতাসে, ছেলেটির হাতে মেয়েটি রাখি পরিয়ে দিল—ব্যস, তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকত না।
যখন রাখি মানে ভাই-বোনের বন্ধন নয়
বাংলায় রাখি আর ভাইফোঁটার টানাপোড়েন চিরকালের। শুদ্ধা দেবনাথ, এখন পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই, স্কুলে পড়ান। কতবার ভেবেছেন, একবারও কি জীবনে দুই দাদাকে রাখি পরিয়েছেন? কিছুতেই মনে পড়ল না। অথচ ভাইফোঁটা তাদের বাড়িতে আজও দারুণ উৎসব।
শুধু শুদ্ধা নন, মেয়েও রাখি নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায় না। যাজ্ঞসেনী এখন কলেজে পড়ছে, তার কাছেও ভাইফোঁটা মানেই আসল ভাই-বোনের উৎসব। মা-মেয়ে দুইজনেরই বিশ্বাস, এই “রাখি” ব্যাপারটা আসলে হিন্দি বলয়ের রীতি।
বলিউড বনাম টলিউড: বলিউডে রাখির চিহ্ন দেখা যায় মিডাস টাচের মত – ‘রাখি কি সৌগন্ধ’ থেকে ‘রক্ষা বন্ধন’—সবাই মেতে আছে। টলিউডে রাখির এত দাপট কোথায়? তাহলে শহরের অলিতে-গলিতে রাখি বিক্রি হয় এত ঝাঁকে ঝাঁকে, সেগুলো কারা কিনছে?
রাখি বিক্রেতা মানস দাসের গল্প
শ্যামবাজারের মানস দাস—কখনও ক্যাসেট বিক্রি করতেন, এখন মরশুমি জিনিসের হকার। রাখির সময় বড়বাজার থেকে নানা রাখি কিনে আনেন, বেশিরভাগই বিক্রি হয়ে যায়। বেশি নেয় কারা? “কলেজের ছেলেমেয়েরা-ই বেশি কেনে,” বললেন মানস। শুনে মনে হয়, সেই ছোট্টো প্রস্তাব কিংবা প্রাক্তন প্রেমের ইশারা কি এখনো ঘুরে বেড়ায় কলেজ চত্বর জুড়ে?
মানস দাসের পর্যবেক্ষণ: “কলেজের ছেলেমেয়েরা-ই বেশি কেনে।” মানে, সেই প্রেম-প্রস্তাবের ঐতিহ্য এখনও বেঁচে আছে কলেজ ক্যাম্পাসে।
রাখির বিবর্তন
রাখিও কিন্তু বদলেছে। মানসের সময়ে স্পঞ্জের রাখি ছিল না। তিনি যা বিক্রি করেন, সেগুলো একেবারে চিকন আর স্লিক; কখনও স্রেফ রঙিন একটা সুতো সেজে থাকে। একটু ডিজাইন থাকলেই দাম বেড়ে যায়। আটের দশকে দশ টাকার রাখিও দেখা যেত—মজবুত, মোটা। এখন তো আরও হালকা রাখিই ফ্যাশন।
অনলাইনে ঢুঁ মারলে ৫০-১০০ টাকা থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত রাখি দেখবেন। চকোলেট, লাড্ডু, কিংবা ড্রাইফ্রুট, সব দিয়ে কম্বো প্যাক, স্বাস্থ্যসচেতন ভাইদের জন্য আলাদা চমক। এখানেও ব্যবসার ঘুণ ধরেছে—হাতঘড়ির কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিয়েছে, “হাতঘড়িই তো আসল রাখি!”—যে রাখি মানে শুধু সুতো না, সময়ের স্মৃতি, বন্ধুত্বের প্রতীক।
রাখির নতুন রূপ: চকোলেট রাখি, ড্রাইফ্রুট রাখি, ব্রেসলেট রাখি—বাজার এখন নানা ডিজাইনে ভরপুর। কিন্তু সেই পাঁচ টাকার সরল রাখির আবেগ কি আর ফিরে পাওয়া যায়?
অফিসে রাখির প্রথা
আরেকটু ভিন্ন প্রথাও আছে। দেবাঞ্জন মিত্র কাজ করেন বিবাদী বাগে, এক প্রাইভেট অফিসে। বললেন, পুরনো অফিসে চোঙা-চোঙা দারোয়ানদের রাখি পরানোর রীতি চলে, তার সঙ্গে বেশ কিছু টাকা দেওয়া হয়। এ প্রথা নতুন ঝকঝকে কর্পোরেট বা আইটি ফার্মে নেই; সেখানে সম্পর্কগুলো এতটাই যান্ত্রিক, যে রাখি বান্ধারও সময় নেই।
আজকের প্রজন্মের উদাসীনতা
আজকের বাঙালি কলেজের সেই রাখির প্রেম-স্মৃতি কতটা বেঁচে আছে? প্রস্তাব, সম্মতি, বা প্রত্যাখ্যানের ভাষাও বদলে গেছে। আজকের ছাত্রছাত্রীরা রাখি নিয়ে অনেকটাই উদাসীন। অনিকেত-ঋদ্ধিমার মতো অনেকেই তাই বলে ফেলছে, “রাখি? সে তো আর আমাদের ব্যাপার নয়!”
সময়ের পরিবর্তন: প্রজন্ম বদলেছে, সম্পর্কের ভাষা বদলেছে। রাখি হয়তো এখন আর সেই ‘টানাটানির অস্ত্র’ নেই। কিন্তু তার জায়গায় কী এলো?
সংস্কার কি মরল?—নতুন অর্থে রাখি
শেষে আসে আসল কথা—সংস্কার কি মরল? হয়তো না। ভেদাভেদের সময়েও রাখির অন্য ছবি দেখা যায়। কোন রাখিপূর্ণিমা নয়—সকালে গঙ্গায় স্নান করে এক বৃদ্ধ, হাতে রাখি নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য ধর্মের মানুষের কাছে, সঙ্গে ছিল গান—“বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাইবোন, এক হউক…”
এই রাখি ছিল ভেদাভেদ-ভাঙার প্রতীক। খাস পুঁথিগত কাহিনি নয়, এই রাখির স্মৃতি, এই একতার বার্তা কি ভুলে থাকা যায়? মনে হয় একদমই না।
রাখির আসল অর্থ: শুধু ভাই-বোনের বন্ধন নয়, রাখি হতে পারে সম্প্রীতির প্রতীক, ভেদাভেদ ভাঙার অস্ত্র। সেই বার্তা হয়তো হারিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পুরোপুরি নয়।
আমার ব্যক্তিগত মত
নব্বইয়ের দশকের সেই রাখির স্মৃতিগুলো আজও অনেকের মনে দাগ কেটে আছে। সেই সময় রাখি ছিল শুধু ভাই-বোনের উৎসব নয়, তা ছিল প্রেম, বন্ধুত্ব, প্রত্যাখ্যান—সবকিছুর এক মিশ্রণ। কলেজ ক্যাম্পাসে রাখির দিন মানে ছিল এক অন্য রকম টানাপোড়েন।
আজকের প্রজন্ম হয়তো সেই আবেগটা বুঝতে পারে না। কিন্তু যারা সেই সময়ে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে রাখি মানে এখনও সেই বৃষ্টিভেজা সকাল, সেই পাঁচ টাকার রাখি, আর সেই হাসি-কান্নার গল্প।
রাখি বদলেছে, সময় বদলেছে। কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে যে উষ্ণতা, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ—সেটা কি আদৌ বদলায়? হয়তো না।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: নব্বইয়ের দশকে কলেজে রাখি দিবস কেমন ছিল?
ছেলেদের মধ্যে আতঙ্কের কারণ ছিল। মেয়েরা রাখি পরে ‘ভাই’ বানিয়ে দিতে পারত, যা ছিল প্রেমের প্রস্তাব এড়ানোর একটি কৌশল। অনেক ছেলে কলেজ এড়িয়ে চলত বা সিনেমা হলে গিয়ে দিন কাটাত।
প্রশ্ন ২: শুভব্রত চক্রবর্তীর গল্পটা কী?
শুভব্রত প্রথম বছর প্রেমে পড়েছিলেন, কিন্তু সম্পর্ক টেকেনি। শেষে মেয়েটি রাখি দিয়ে তাকে ‘ভাই’ বানিয়ে দেয়। শুভব্রত এখন মনে করেন, সেই রাখিই তাদের দুজনকে বাঁচিয়েছিল।
প্রশ্ন ৩: বাংলায় রাখি ও ভাইফোঁটার মধ্যে পার্থক্য কী?
ভাইফোঁটা বাংলার ঐতিহ্যবাহী ভাই-বোনের উৎসব। রাখি মূলত উত্তর ভারতীয় প্রভাব, যা কলকাতার কলেজগুলোতে বেশি প্রচলিত ছিল।
প্রশ্ন ৪: রাখির ডিজাইন কিভাবে বদলেছে?
আটের দশকে রাখি ছিল মোটা ও মজবুত। এখন চিকন, স্লিক, ব্রেসলেট স্টাইলের রাখি বেশি চলছে। অনলাইনে ৫০ থেকে কয়েক হাজার টাকার রাখি পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ৫: আজকের প্রজন্ম কীভাবে রাখি দেখে?
অনেকেই রাখি নিয়ে উদাসীন। তাদের কাছে ভাইফোঁটাই আসল ভাই-বোনের উৎসব। তবে কলেজগুলোতে এখনও কিছুটা ট্রেন্ড থাকে।
প্রশ্ন ৬: রাখির কোনো সামাজিক গুরুত্ব আছে?
হ্যাঁ। অনেক সময় রাখি সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধর্মের মানুষও রাখি বাঁধেন ভেদাভেদ ভাঙার জন্য।
প্রশ্ন ৭: অফিসে রাখি পরানোর রীতি কী?
পুরনো অফিসগুলোতে দারোয়ানদের রাখি পরানোর রীতি ছিল, সঙ্গে কিছু টাকা দেওয়া হতো। কিন্তু কর্পোরেট জগতে এখন সেই প্রথা কমে গেছে।
প্রশ্ন ৮: রাখি কি শুধু হিন্দু উৎসব?
মূলত হিন্দু উৎসব হলেও, এখন বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষও রাখি বাঁধেন। এটি এখন একটি সার্বজনীন সম্পর্কের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ লিংক
এই পোস্টটি শেয়ার করুন
শেয়ার বাটনে ক্লিক করলেই সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট শেয়ার হবে।