আয়ুষ্মান ভারতে যোগ্য হলেই স্বাস্থ্যসাথী নয়! রাজ্য সরকারের নতুন কঠোর নির্দেশনা ২০২৬

২২ অগাস্ট, ২০২৬ লেখক: Deb Sarkar পড়তে ৮ মিনিট স্বাস্থ্য প্রকল্প
Ayushman Bharat and Swasthya Sathi New Rules

রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় বড়সড় বদল আনতে এবার স্পষ্ট নিয়ম চালু করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সঙ্গে স্বাস্থ্যসাথীকে সমন্বয় করে নতুন একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে, যা ইতিমধ্যেই রাজ্যের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার স্বাস্থ্যভবন থেকে এই সংক্রান্ত অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

এখন থেকে রাজ্যে আয়ুষ্মান ভারত ও স্বাস্থ্যসাথী—এই দুটি প্রকল্পই একসঙ্গে চলবে, কিন্তু কোন রোগী কোন প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসা পাবেন, তা নির্ধারণের জন্য হাসপাতালগুলোকে কিছু কড়া নিয়ম মেনে চলতে হবে। প্রশাসনিক মহলের খবর, এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হল দুই প্রকল্পের মধ্যে স্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ করা, যাতে কোনো রোগী আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা পেলেও ভুলবশত স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় ডাবল বিলিং বা অন্য কোনো জটিলতা তৈরি না হয়।

মূল নিয়মটি এক কথায়: কোনো রোগী যদি আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের জন্য যোগ্য হন (তাঁর নাম আয়ুষ্মান তালিকায় থাকে), তাহলে প্রথমে আয়ুষ্মান ভারতের আওতাতেই তাঁর চিকিৎসা শুরু করতে হবে। কেবলমাত্র আয়ুষ্মান পোর্টালে কোনো কারিগরি সমস্যা (facing issue) থাকলেই, সেই সমস্যার প্রমাণ (স্ক্রিনশট) জমা দিয়ে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে রোগীকে স্থানান্তর করা যাবে।

কেন এই নতুন নিয়মের প্রয়োজন পড়ল?

সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালে দেখা যাচ্ছিল, আয়ুষ্মান ভারত কার্ডধারী অনেক রোগীকে সরাসরি স্বাস্থ্যসাথীর আওতায় ভর্তি করা হচ্ছে। অথচ, আয়ুষ্মান ভারত একটি কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্প, যেখানে চিকিৎসা খরচ সরাসরি কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে বহন করা হয়। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসাথী রাজ্য সরকারের নিজস্ব প্রকল্প। এই দুইয়ের মধ্যে দ্বৈততা তৈরি হলে একদিকে যেমন রাজ্যের কোষাগারের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার হয় না।

স্বাস্থ্যভবন সূত্রে খবর, বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় পড়া রোগীরা স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে চিকিৎসা করিয়ে রাজ্য সরকারের টাকা খরচ করছেন, যা প্রশাসনের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানেই ২২শে অগাস্ট, ২০২৬ থেকে এই নতুন নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে। এখন রোগী ভর্তির সময় থেকেই ঠিক করতে হবে তিনি কোন প্রকল্পের সুবিধা পাবেন।

হাসপাতালে রোগী ভর্তির সময় কী করবেন?

নতুন নির্দেশনায় হাসপাতালগুলোর জন্য একটি পাঁচ ধাপের প্রক্রিয়া ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমেই যখন কোনও রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে আসবেন, তখন তাকে তাঁর আধার নম্বর দিতে হবে। হাসপাতালের কর্মীরা সেই আধার নম্বর দিয়ে স্বাস্থ্যসাথী পোর্টালে অনুসন্ধান করবেন। এই অনুসন্ধানের মাধ্যমেই বোঝা যাবে রোগী আয়ুষ্মান ভারতের তালিকায় রয়েছেন কিনা।

হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া:
১. রোগীর আধার নম্বর দিয়ে স্বাস্থ্যসাথী পোর্টাল চেক করুন।
২. রোগী আয়ুষ্মান ভারতের যোগ্য কিনা, তা যাচাই করুন।
৩. যোগ্য হলে, আয়ুষ্মান পোর্টালে চিকিৎসা শুরু করুন।
৪. আয়ুষ্মান পোর্টালে সমস্যা থাকলে, 'ফেসিং ইস্যু' অপশনে সমস্যা লিখে স্ক্রিনশট আপলোড করুন।
৫. শুধুমাত্র স্ক্রিনশট জমা দেওয়ার পরই স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে রোগীকে স্থানান্তর করা যাবে।

এই নির্দেশিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আগে অনেক হাসপাতাল সরাসরি আয়ুষ্মান পোর্টাল এড়িয়ে রোগীকে স্বাস্থ্যসাথীতে ভর্তি করত। এবার থেকে তা সম্ভব নয়। আয়ুষ্মান পোর্টালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা না গেলে তবেই বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হবে, এবং তার জন্য পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্টেশন বাধ্যতামূলক।

সতর্কবার্তা: কোনোভাবেই স্ক্রিনশট বা সমস্যার বিবরণ ছাড়া রোগীকে সরাসরি স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে স্থানান্তর করা যাবে না। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আয়ুষ্মান তালিকায় নাম থাকলেও কার্ড না থাকলে কী করবেন?

অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাঁদের নাম আয়ুষ্মান ভারতের তালিকায় রয়েছে, কিন্তু এখনও শারীরিক বা ডিজিটাল কার্ড তৈরি হয়নি। এই পরিস্থিতিতে রোগীকে প্রথমে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় ভর্তি করা যাবে। তবে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালকে রোগীর ই-কেওয়াইসি (e-KYC) সম্পূর্ণ করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ না হলে পরবর্তী পর্যায়ে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে ক্লেম নেওয়া যায় না, তাই এই বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি।

আবার, কিছু রোগী আয়ুষ্মান তালিকায় থাকলেও তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল নম্বর আপডেট না থাকায় কার্ড তৈরি হয়নি। হাসপাতালের দায়িত্ব হবে এই ধরনের রোগীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা নেওয়া এবং প্রশাসনিক স্তরে ই-কেওয়াইসি সম্পন্ন করা। প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে, ই-কেওয়াইসি বাকি থাকলে কোনো অবস্থাতেই আয়ুষ্মান ভারতের টাকা ছাড় করা হবে না। তাই এই ফাঁকে রোগী স্বাস্থ্যসাথীতে চিকিৎসা পেলেও, হাসপাতালকে অবশ্যই ই-কেওয়াইসির প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে হবে।

৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী রোগীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা

এই নতুন নিয়মে ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী রোগীদের জন্য একটি বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য আলাদাভাবে একটি রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি রয়েছে। যদি কোনও বয়স্ক রোগী আয়ুষ্মান ভারতের তালিকায় থাকেন, তাহলে তাঁকে আগে এই বয়সভিত্তিক আলাদা রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ করতে হবে। সেই রেজিস্ট্রেশন শেষ হলেই কেবল আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় তাঁর চিকিৎসা শুরু করা যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৭০+ বয়সীদের জন্য এই আলাদা রেজিস্ট্রেশন চালু করার মূল কারণ হল, এই বয়সগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে অন্য রোগের পাশাপাশি বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা বেশি থাকে। আলাদা রেজিস্ট্রেশনে তাদের মেডিক্যাল ইতিহাস, বর্তমান ওষুধ ও কোমর্বিডিটি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যা চিকিৎসার মান উন্নত করতে সাহায্য করে। রাজ্যের এক স্বাস্থ্য আধিকারিক জানিয়েছেন, "৭০ বছরের বেশি বয়সী রোগীদের জন্য এই রেজিস্ট্রেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শেষ না করে তাঁদের আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে চিকিৎসা শুরু করলে, পরে ক্লেম নিতে প্রচুর জটিলতা তৈরি হয়।"

ভালো খবর: এই আলাদা রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং হাসপাতালের কর্মীরাই রোগীকে সেই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করবেন। তাই ৭০+ রোগী বা তাদের পরিবারের সদস্যদের আলাদাভাবে কোথাও যেতে হবে না।

যাঁদের নাম কোনও তালিকাতেই নেই, তাঁরা কী করবেন?

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি কারও নাম আয়ুষ্মান ভারতের তালিকাতেও না থাকে, এবং কোনো কারণে তিনি স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায়ও পড়েন না, তাহলে তাঁর কী হবে? নতুন নিয়মে সেই বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যদি রোগীর নাম আয়ুষ্মান ভারত তালিকায় না থাকে এবং স্বাস্থ্যসাথী পোর্টালেও তাঁর কোনো তথ্য না থাকে, তাহলে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা (CM Health Insurance Scheme) -এর ফর্ম পূরণ করতে হবে। এই ফর্ম পূরণের মাধ্যমেই তিনি স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন। অর্থাৎ, আয়ুষ্মান ও স্বাস্থ্যসাথী—দুই জায়গাতেই রোগীর নাম না থাকলেও, মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনার ফর্ম পূরণ করিয়ে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে এখানেও হাসপাতালগুলোর বাড়তি দায়িত্ব আছে। ফর্ম পূরণের পর সেই ফর্ম যাচাই করে রোগীর আবেদন অনুমোদন করতে হবে। যেহেতু এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে রোগী ও তাঁর পরিবারকে ধৈর্য ধরে এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এই ব্যবস্থার ফলে কোনো রোগীই যাতে প্রকল্পের আওতার বাইরে থেকে চিকিৎসা বিমুখ না হন, সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।

এই নিয়মের প্রভাব সাধারণ মানুষের উপর

সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের কাছে এই নিয়মটি প্রথমে কিছুটা জটিল মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি অত্যন্ত কার্যকরী। কারণ, আগে অনেক হাসপাতাল রোগীদের প্রকল্প বাছাই করতে গিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করত। কোথায় ক্লেম দিতে হবে, কোন পোর্টালে বিল জমা দিতে হবে—এই সব নিয়ে জটিলতা তৈরি হতো। ফলে রোগীর চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হতো বা অনেক সময় বিল জমা না দেওয়ায় হাসপাতাল রোগীকে ছেড়ে দিতে চাইত না।

এখন সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে। রোগী ভর্তির সময়েই ঠিক হয়ে যাবে তিনি কোন প্রকল্পের সুবিধা পাবেন, এবং হাসপাতাল কোন পোর্টালে বিল জমা দেবে। এটি রোগী ও হাসপাতাল—উভয়ের জন্যই স্বস্তির খবর। রাজ্যের এক জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিক আমাদের জানিয়েছেন, "এই নতুন নিয়মের ফলে হাসপাতালগুলোর কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। আগে আমরা দু-তিনদিন ধরে রোগীর প্রকল্প নিয়ে কনফিউশনে পড়ে থাকতাম। এখন অ্যাডমিশনের সময়েই সব ক্লিয়ার হয়ে যায়।"

রোগীদের করণীয়: হাসপাতালে যাওয়ার সময় আপনার আধার কার্ড, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড (যদি থাকে), এবং মোবাইল নম্বর সঙ্গে রাখুন। আপনি আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় পড়েন কিনা, তা আগে থেকেই www.pmjay.gov.in-এ গিয়ে চেক করে নিতে পারেন।

হাসপাতাল প্রশাসনের নতুন চ্যালেঞ্জ

যদিও এই নিয়ম রোগীদের সুবিধার জন্য, হাসপাতাল প্রশাসনের জন্য এটি একটি নতুন চ্যালেঞ্জ বটে। একদিকে যেমন আয়ুষ্মান পোর্টাল ও স্বাস্থ্যসাথী পোর্টাল—দুটো প্ল্যাটফর্মে একসাথে কাজ করতে হবে, অন্যদিকে ই-কেওয়াইসি ও ৭০+ রেজিস্ট্রেশনের বাড়তি কাজ সামলাতে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ইতিমধ্যেই কলকাতার বড় হাসপাতালগুলোতে কর্মীদের এই নতুন নিয়ম নিয়ে ওরিয়েন্টেশন দেওয়া শুরু হয়েছে।

স্বাস্থ্যভবন সূত্রে খবর, এই নির্দেশিকা মেনে চলতে কোন হাসপাতাল অবহেলা করলে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মধ্যে লাইসেন্স বাতিল পর্যন্ত হতে পারে। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও এই বিষয়টি অত্যন্ত সিরিয়াসলি নিয়েছে। পাশাপাশি, রোগীরা যদি মনে করেন তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো প্রকল্পে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, তাহলে তাঁরা সরাসরি স্বাস্থ্যভবনের হেল্পলাইনে অভিযোগ জানাতে পারেন।

আর্থিক দিক ও বাজেট বণ্টন

এই নিয়মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আর্থিক স্বচ্ছতা। রাজ্য সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের টাকা শুধুমাত্র আয়ুষ্মান ভারতের মধ্যেই খরচ হবে, এবং স্বাস্থ্যসাথীর টাকা স্বাস্থ্যসাথীর মধ্যেই। এই বণ্টন ঠিকমতো না হলে রাজ্যের অর্থ বিভাগ থেকে বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি রয়েছে। গত বছর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে প্রায় ৪০ লক্ষ পরিবার স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছে, আর আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় রয়েছে প্রায় ১২ লক্ষ পরিবার। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের মধ্যে সঠিক প্রকল্প বণ্টন অত্যন্ত জরুরি।

আর্থিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নির্দেশিকা কার্যকর হলে রাজ্যের স্বাস্থ্য খাতে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে, যা আগে বিভিন্ন জটিলতায় ডুপ্লিকেট ক্লেমের খাতায় চলে যেত। সেই টাকা এখন অন্যান্য স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

ডিজিটাল পোর্টালগুলোর ভূমিকা

আয়ুষ্মান ভারত ও স্বাস্থ্যসাথী—এই দুটি প্রকল্পই এখন সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হয়। তাই পোর্টালগুলোর সঠিক কার্যকারিতা বজায় রাখাও অত্যন্ত জরুরি। নতুন নিয়মে হাসপাতালগুলোকে একাধিকবার পোর্টাল ব্যবহার করতে হচ্ছে। তাই টেকনিক্যাল টিমগুলোকে সবসময় অলার্ট থাকতে বলা হয়েছে।

যদি কোনো কারণে আয়ুষ্মান ভারত পোর্টাল ডাউন থাকে, তাহলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অফলাইন মোডে রোগীর তথ্য সংরক্ষণ করতে পারবে, তবে সেই তথ্য পুনরায় অনলাইনে আপলোড করতে হবে। এই বিষয়টিও নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা আছে। তাই রোগীদের এই নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রশাসন সবদিক খেয়াল রেখেছে।

চিকিৎসক ও নার্সদের মতামত

রাজ্যের একাধিক বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা এই নিয়মকে স্বাগত জানিয়েছেন। কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালের সিনিয়র চিকিৎসক ডা. অরবিন্দ মিত্র বলেন, "আগে রোগী ভর্তির সময় আমরা জানতাম না তিনি কোন প্রকল্পে আসবেন। এখন এই নিয়মের ফলে রোগী ভর্তি হওয়ার আগেই সব পেপারওয়ার্ক শেষ হয়ে যায়। ফলে আমরা রোগীর চিকিৎসায় বেশি সময় দিতে পারি।"

অন্যদিকে, কিছু নার্সিং স্টাফ জানিয়েছেন যে প্রাথমিকভাবে এই নতুন ডিজিটাল প্রক্রিয়া তাদের কাছে কিছুটা কঠিন লাগলেও, প্রশিক্ষণের পর তা সহজ হয়ে যাচ্ছে। রাজ্য সরকার আগামী এক মাসের মধ্যে সব জেলা হাসপাতালের কর্মীদের এই সংক্রান্ত বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে।

সবশেষে: সরকার এবার নিয়ম খুব স্পষ্ট করে দিয়ে দিল—কে কোন প্রকল্পের সুবিধা পাবেন, আর কোথায় চিকিৎসা হবে, সেটা ভুল হোক বা গড়মিল—অ্যাডমিশনের সময়েই ক্লিয়ার করতে হবে। এই নির্দেশিকা কেবল হাসপাতালের জন্য নয়, রোগী ও তাদের পরিবারের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজের যোগ্যতা যাচাই করে নিয়ে হাসপাতালে যান, আর প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী সঠিক প্রকল্পেই চিকিৎসা করান।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: আমি স্বাস্থ্যসাথী কার্ডধারী। এখন কি আমার চিকিৎসা বন্ধ হবে?

মোটেই নয়। নতুন নিয়ম শুধু আয়ুষ্মান ভারতের জন্য যোগ্য রোগীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যাঁরা আয়ুষ্মান ভারতের জন্য যোগ্য নন, তাঁরা আগের মতোই স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে চিকিৎসা পাবেন।

প্রশ্ন ২: আমি কীভাবে বুঝব আমি আয়ুষ্মান ভারতের জন্য যোগ্য কিনা?

আপনি www.pmjay.gov.in ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনার আধার নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করতে পারেন। অথবা হাসপাতালে ভর্তির সময় কর্মীরা তা চেক করে জানিয়ে দেবেন।

প্রশ্ন ৩: আয়ুষ্মান পোর্টালে সমস্যা হলে আমি কি সরাসরি স্বাস্থ্যসাথীতে চিকিৎসা নিতে পারব?

না। প্রথমে ‘ফেসিং ইস্যু’ অপশনে সমস্যার বিবরণ দিয়ে স্ক্রিনশট আপলোড করতে হবে। তারপরই কেবল স্বাস্থ্যসাথীতে স্থানান্তর করা যাবে।

প্রশ্ন ৪: ৭০ বছরের বেশি বয়সী হলে কী বাড়তি কাগজপত্র লাগে?

হ্যাঁ, আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে চিকিৎসা নিতে ৭০+ রোগীদের আলাদা রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে। হাসপাতালের কর্মীরাই এই রেজিস্ট্রেশন করতে সাহায্য করবেন।

প্রশ্ন ৫: আমার নাম আয়ুষ্মান তালিকায় আছে কিন্তু কার্ড তৈরি হয়নি। এখন কী করব?

প্রথমে আপনাকে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ভর্তি করা হবে। তবে হাসপাতাল আপনার ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ করবে, যাতে পরে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে ক্লেম নেওয়া যায়।

প্রশ্ন ৬: আমি যদি দুটি প্রকল্পেরই তালিকায় না থাকি, তাহলে কী হবে?

সেক্ষেত্রে আপনাকে মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা -এর ফর্ম পূরণ করতে হবে। ফর্ম পূরণের পর আপনি স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের সুবিধা পাবেন।

প্রশ্ন ৭: হাসপাতাল যদি নিয়ম না মানে, তাহলে আমি কোথায় অভিযোগ করব?

আপনি সরাসরি স্বাস্থ্যভবন বা সংশ্লিষ্ট জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের হেল্পলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন। অভিযোগ পেলে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।

প্রশ্ন ৮: ই-কেওয়াইসি না থাকলে কি চিকিৎসা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়?

না। ই-কেওয়াইসি না থাকলেও রোগী স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে চিকিৎসা পাবেন। তবে হাসপাতালকে ই-কেওয়াইসি সম্পূর্ণ করার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

শেয়ার বাটনে ক্লিক করলেই সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট শেয়ার হবে।

Deb Sarkar

লেখক: Deb Sarkar

Deb Sarkar পশ্চিমবঙ্গের সরকারি প্রকল্প, কেন্দ্রীয় সরকারি স্কিম, শিক্ষা ও ডিজিটাল পরিষেবা বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। তিনি বিভিন্ন সরকারি বিজ্ঞপ্তি, অফিসিয়াল পোর্টাল এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করে পাঠকদের কাছে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন।

✓ Fact Checked Content ✓ Social Welfare Researcher ✓ Updated Information