ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা শুরু করে কিভাবে টাকা উপার্জন করা যায় | সম্পূর্ণ গাইড

ভ্রমণ মানেই শুধু ঘোরাঘুরি নয়, আজকের দিনে ভ্রমণ নিজেই একটি বড় ব্যবসা। করোনা পরবর্তী সময়ে মানুষ আবার নতুন করে বেরিয়ে পড়ছে পাহাড়, সমুদ্র, তীর্থস্থান আর বিদেশ ভ্রমণের পথে। এই বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা নতুন করে সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু অনেকের মনেই প্রশ্ন, ট্রাভেল এজেন্সি খুলে আদৌ কি টাকা রোজগার করা যায়, নাকি বড় সংস্থা ছাড়া এই ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন।

বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, সঠিক পরিকল্পনা, লোকাল নেটওয়ার্ক এবং পরিষেবার মান ঠিক থাকলে ছোট শহর বা গ্রাম থেকেও সফল ট্রাভেল এজেন্সি গড়ে তোলা সম্ভব।

ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা আসলে কী

ট্রাভেল এজেন্সি মানে শুধু টিকিট কাটা নয়। এই ব্যবসার মধ্যে রয়েছে ট্যুর প্ল্যান তৈরি করা, হোটেল বুকিং, গাড়ি ব্যবস্থা, তীর্থযাত্রী বা পর্যটকদের গাইড করা, ভিসা সহায়তা এবং নানা ধরনের ভ্রমণ সংক্রান্ত পরিষেবা।

ভারতের প্রেক্ষাপটে ট্রাভেল এজেন্সি বলতে অনেক সময় মানুষ বোঝে রেল বা বিমানের টিকিট কাটা। কিন্তু বাস্তবে এখানেই শেষ নয়। বরং টিকিটের বাইরে যে পরিষেবাগুলি দেওয়া যায়, সেখানেই আসল লাভের জায়গা।

কেন ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসার চাহিদা বাড়ছে

আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষ নিজের হাতে সব পরিকল্পনা করতে চায় না। কোথায় যাবেন, কোথায় থাকবেন, কীভাবে ঘুরবেন, এই সব কিছু এক জায়গা থেকে পেলে মানুষ স্বস্তি পায়।

বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারী এবং তীর্থযাত্রীরা ট্রাভেল এজেন্সির উপর ভরসা করেন। যেমন বাংলায় প্রতিবছর চারধাম, কাশী, পুরী বা বৈষ্ণোদেবী যাত্রার চাহিদা বিপুল।

এছাড়া ছোট শহর বা গ্রামাঞ্চলে এখনও অনেক মানুষ অনলাইন বুকিংয়ে স্বচ্ছন্দ নন। তাঁদের জন্য স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সিই ভরসা।

ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা শুরু করতে কী লাগে

অনেকেই ভাবেন, এই ব্যবসা শুরু করতে বিশাল অফিস বা বড় পুঁজি দরকার। বাস্তবে তা নয়।

শুরুতে একটি ছোট অফিস বা এমনকি বাড়ির একটি ঘর থেকেই কাজ শুরু করা যায়। দরকার একটি কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ এবং প্রাথমিক সফটওয়্যার জ্ঞান।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার ক্ষমতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা। কারণ এই ব্যবসা বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকে।

কোন ধরনের ট্রাভেল এজেন্সি করলে লাভের সম্ভাবনা বেশি

সব ধরনের ট্রাভেল এজেন্সি সবার জন্য নয়। নিজের এলাকার চাহিদা বুঝে ব্যবসার ধরন ঠিক করা জরুরি।

যেমন, পশ্চিমবঙ্গে থাকলে দার্জিলিং, দীঘা, পুরী, কাশী বা নেপাল ট্যুর খুব জনপ্রিয়। দক্ষিণ ভারতে থাকলে তীর্থযাত্রা ভিত্তিক প্যাকেজ বেশি চলে। কেরালা বা রাজস্থানের মতো জায়গায় হানিমুন ও হেরিটেজ ট্যুর জনপ্রিয়।

লোকাল চাহিদা বুঝে প্যাকেজ বানাতে পারলে কম খরচে বেশি লাভ করা সম্ভব।

টিকিট বুকিং থেকে আয় কতটা

রেল বা বিমানের টিকিট বুকিং থেকে আয় খুব বেশি নয়। প্রতিটি টিকিটে কমিশন সীমিত। তাই শুধু টিকিট কেটে বড় আয় আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

কিন্তু টিকিটের সঙ্গে হোটেল, গাড়ি, খাবার এবং দর্শনীয় স্থান ঘোরানোর ব্যবস্থা করলে মোট প্যাকেজ থেকে ভালো মার্জিন পাওয়া যায়।

অভিজ্ঞ ট্রাভেল এজেন্টরা তাই টিকিটকে শুধুই প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করেন।

ট্যুর প্যাকেজ বানিয়ে আয় করার কৌশল

নিজস্ব ট্যুর প্যাকেজ এই ব্যবসার সবচেয়ে বড় শক্তি। একটি ভালো প্যাকেজ মানে নির্দিষ্ট দামে নির্দিষ্ট পরিষেবা, যাতে গ্রাহক আগেই খরচ বুঝে নিতে পারেন।

ধরা যাক, কলকাতা থেকে পুরী তিন দিনের প্যাকেজ। ট্রেন, হোটেল, স্থানীয় গাড়ি, জগন্নাথ দর্শন সব কিছু মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট দাম। এই প্যাকেজে প্রতিজনের পিছনে যে মার্জিন রাখা হয়, সেটাই এজেন্সির লাভ।

একই প্যাকেজ বছরে বহুবার বিক্রি হলে মোট আয় অনেকটাই বেড়ে যায়।

তীর্থযাত্রীদের উপর ফোকাস করলে কেন লাভ বেশি

ভারতে তীর্থভ্রমণের বাজার সবসময়ই সক্রিয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের তীর্থে যাওয়ার ইচ্ছা বাড়ে, কিন্তু নিজের হাতে সব ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না।

এই জায়গায় ট্রাভেল এজেন্সির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চারধাম, অমরনাথ, কাশী, পুরী, তিরুপতি এই সব জায়গার জন্য বিশেষ প্যাকেজ তৈরি করলে নিয়মিত গ্রাহক পাওয়া যায়।

অনেক এজেন্সি শুধুমাত্র তীর্থযাত্রার উপর নির্ভর করেই বছরের পর বছর লাভজনক ব্যবসা চালাচ্ছে।

হোটেল ও গাড়ি মালিকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া কেন জরুরি

ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায় লোকাল নেটওয়ার্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ। হোটেল মালিক, গাড়ি চালক, গাইডদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলে কম দামে পরিষেবা পাওয়া যায়।

এই কম খরচের সুবিধাই গ্রাহককে ভালো দাম দিতে সাহায্য করে, আবার এজেন্সির লাভও বজায় থাকে।

বিশেষ করে পাহাড় বা পর্যটন এলাকায় স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক ব্যবসাকে অনেক দূর এগিয়ে দেয়।

অনলাইন উপস্থিতি না থাকলে সমস্যা কোথায়

আজকের দিনে শুধুমাত্র অফলাইন ব্যবসা করলে সুযোগ হাতছাড়া হয়। একটি সাধারণ ওয়েবসাইট, গুগল ম্যাপে নাম, এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় উপস্থিতি নতুন গ্রাহক আনতে সাহায্য করে।

অনেকেই গুগলে সার্চ করে স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সি খোঁজেন। সেখানে আপনার নাম থাকলে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে।

অনলাইন মানেই বড় খরচ নয়। নিয়মিত তথ্য আপডেট আর গ্রাহকের রিভিউই অনেক সময় সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠে।

গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জনই আসল পুঁজি

এই ব্যবসায় একবার বিশ্বাস হারালে ফেরানো কঠিন। তাই প্রতিশ্রুত পরিষেবা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

হোটেলের মান, গাড়ির অবস্থা, সময়ানুবর্তিতা এই সব কিছুতেই নজর দিতে হয়। সন্তুষ্ট গ্রাহকই ভবিষ্যতের বিজ্ঞাপন।

ভারতের বহু ছোট ট্রাভেল এজেন্সি শুধুমাত্র মুখে মুখে প্রচারের উপর ভর করে টিকে আছে।

আয় কত হতে পারে বাস্তবে

আয় নির্ভর করে কাজের ধরন ও পরিমাণের উপর। শুরুতে মাসে খুব বড় আয় নাও হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত কয়েকটি প্যাকেজ বিক্রি হলে ধীরে ধীরে আয় বাড়ে।

একটি মাঝারি মানের এজেন্সি মাসে কয়েকটি গ্রুপ ট্যুর করাতে পারলে ভালো রোজগার সম্ভব। বিশেষ মরসুমে আয় আরও বাড়ে।

কোন ভুলগুলো করলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়

অতিরিক্ত লাভের লোভে পরিষেবার মান কমানো সবচেয়ে বড় ভুল। এছাড়া গ্রাহককে সব শর্ত পরিষ্কার না জানালে পরে ঝামেলা হয়।

আইনি কাগজপত্র বা লাইসেন্স উপেক্ষা করলেও ভবিষ্যতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

নতুনদের জন্য বাস্তব পরামর্শ

শুরুতে বড় ঝুঁকি না নিয়ে ছোট প্যাকেজ দিয়ে কাজ শুরু করা ভালো। অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিষেবা বাড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ।

লোকাল ভ্রমণ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বড় ট্যুরে যাওয়া অনেক বেশি নিরাপদ।

শেষ কথা

ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা কোনও রাতারাতি ধনী হওয়ার রাস্তা নয়। কিন্তু ধৈর্য, সততা এবং পরিকল্পনা থাকলে এটি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী আয়ের উৎস হতে পারে।

ভারতের মতো দেশে ভ্রমণের চাহিদা কখনও ফুরোবে না। সেই চাহিদাকে সঠিকভাবে ধরতে পারলেই ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা সত্যিই লাভের মুখ দেখতে পারে।

Know more: গুগল অ্যাডসেন্সের শীর্ষ আয়কারী কারা? ব্লগার ও ইউটিউবারদের বাস্তব তালিকা ও আয়ের রহস্য

Know more: আমি কিভাবে ইমপ্যাক্ট অ্যাফিলিয়েট ব্যবহার করে ৪৫ দিনে ১২,৩০০ টাকা আয় করেছি – বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সম্পূর্ণ গাইড

1 thought on “ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা শুরু করে কিভাবে টাকা উপার্জন করা যায় | সম্পূর্ণ গাইড”

Leave a Comment