আমি কিভাবে ইমপ্যাক্ট অ্যাফিলিয়েট ব্যবহার করে ৪৫ দিনে ১২,৩০০ টাকা আয় করেছি – বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সম্পূর্ণ গাইড

অনলাইনে আয় নিয়ে কথা উঠলেই আজকাল অনেকের চোখে একরাশ সন্দেহ। কেউ বলেন সবটাই ভুয়ো, কেউ বলেন এগুলো কেবল ইউটিউবের গল্প। আমিও ঠিক এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। চাকরি বা ছোট ব্যবসার বাইরে অনলাইন থেকে নিয়মিত আয় করা আদৌ সম্ভব কি না, সেটা নিয়ে আমার নিজের মনেই প্রশ্ন ছিল। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময় ধারণা ভেঙে দেয়। আজ সেই অভিজ্ঞতার কথাই বলব, যেখানে কোনো কোর্স বিক্রি নয়, কোনো স্ক্যাম নয়, শুধু পরিকল্পনা আর ধৈর্যের জোরে ইমপ্যাক্ট অ্যাফিলিয়েট ব্যবহার করে ৪৫ দিনে ১২,৩০০ টাকা আয় করা সম্ভব হয়েছে।

এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে স্বপ্ন দেখানো নয়। বরং কীভাবে ধাপে ধাপে কাজ করেছি, কোথায় ভুল করেছি, কোন জিনিসগুলো কাজ করেছে আর কোনগুলো করেনি, সেগুলো খোলাখুলি বলা।

অনলাইন আয়ের খোঁজ শুরু যেভাবে

করোনার পর থেকে অনলাইনে কাজের দিকে ঝোঁক বেড়েছে অনেকেরই। আমার ক্ষেত্রেও আলাদা কিছু হয়নি। ইউটিউব, ফেসবুক, ব্লগ, এসব জায়গায় নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করতাম। কিন্তু সরাসরি আয়ের পথটা পরিষ্কার ছিল না। গুগল অ্যাডসেন্স পেতে সময় লাগে, ভিজিট না হলে আয় হয় না। স্পনসরশিপ আসে অনেক পরে। তখনই অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ের কথা মাথায় আসে।

অ্যামাজন অ্যাফিলিয়েট অনেকেই করেন, কিন্তু সেখানে কমিশন কম, আবার অ্যাকাউন্ট ব্লক হওয়ার ভয়ও থাকে। ঠিক সেই সময় এক বন্ধুর মুখে প্রথম শুনি ইমপ্যাক্ট অ্যাফিলিয়েটের নাম।

ইমপ্যাক্ট অ্যাফিলিয়েট আসলে কী

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ইমপ্যাক্ট একটি অ্যাফিলিয়েট নেটওয়ার্ক। এখানে এক জায়গায় বহু ব্র্যান্ডের অফার পাওয়া যায়। আপনি কোনো প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের লিংক শেয়ার করবেন। কেউ সেই লিংক দিয়ে কিছু কিনলে বা সাইন আপ করলে আপনি কমিশন পাবেন।

এখানে অ্যামাজনের মতো শুধুই প্রোডাক্ট নয়। ব্যাংকিং অ্যাপ, ফিনটেক অ্যাপ, অনলাইন কোর্স, হোস্টিং সার্ভিস, এমনকি কিছু ভারতীয় স্টার্টআপের অফারও থাকে। কমিশন তুলনামূলকভাবে বেশি, আর সবচেয়ে বড় কথা পেমেন্ট সিস্টেম বেশ স্বচ্ছ।

অ্যাকাউন্ট খোলার অভিজ্ঞতা

ইমপ্যাক্ট অ্যাফিলিয়েটে অ্যাকাউন্ট খুলতে খুব বেশি ঝামেলা হয়নি। নিজের ওয়েবসাইটের লিংক দিয়েছিলাম। ইউটিউব চ্যানেল বা সোশ্যাল মিডিয়ার লিংক থাকলেও চলে। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ফাঁকা প্রোফাইল হলে অনেক ব্র্যান্ড আপনাকে অ্যাপ্রুভ নাও করতে পারে।

আমি যেটা করেছি, সেটা হল আগে থেকেই নিজের সাইটে কিছু কাজের কনটেন্ট রেখেছিলাম। লোকাল সমস্যার সমাধান, টুলস নিয়ে লেখা, সাধারণ মানুষের কাজে লাগে এমন পোস্ট। এর ফলে অ্যাপ্রুভাল পেতে সুবিধা হয়েছে।

প্রথম যে ভুলগুলো করেছিলাম

অ্যাকাউন্ট খোলার পরই অনেকে যেটা করেন, আমিও প্রথমে সেটাই করেছিলাম। এলোমেলোভাবে লিংক শেয়ার করা। কোন প্রোডাক্ট আমার অডিয়েন্সের কাজে লাগবে, সেটা না ভেবে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ফেসবুক পোস্টে লিংক ছড়িয়ে দিয়েছিলাম।

ফলাফল ছিল শূন্য। ক্লিক এসেছে, কিন্তু কনভার্সন হয়নি। তখন বুঝলাম, অ্যাফিলিয়েট মানে শুধু লিংক শেয়ার করা নয়। মানুষের সমস্যার সঙ্গে প্রোডাক্টের সম্পর্ক থাকতে হবে।

স্ট্র্যাটেজি বদলানোর সিদ্ধান্ত

প্রায় এক সপ্তাহ নষ্ট করার পর বসে ভাবলাম, আমার অডিয়েন্স কারা। বেশিরভাগই ছোট ব্যবসায়ী, ব্লগার, ইউটিউবার, অনলাইন কাজ শিখতে আগ্রহী মানুষ। তাহলে ফ্রিজ, মোবাইলের লিংক শেয়ার করে লাভ কী।

এরপর ফোকাস করলাম তিনটি ক্যাটাগরিতে।

এক নম্বর ফিনটেক এবং মানি রিলেটেড অ্যাপ
দুই নম্বর ওয়েবসাইট এবং ডিজিটাল টুলস
তিন নম্বর অনলাইন সার্ভিস যা ভারতীয়রা ব্যবহার করেন

লোকাল উদাহরণ কেন কাজে দেয়

একটি বড় ভুল অনেকেই করেন। বিদেশি উদাহরণ দেন। কিন্তু ভারতের মানুষ নিজের মতো গল্প শুনতে চায়। আমি তাই নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের ভাষায়, নিজের এলাকার মানুষের সমস্যা তুলে ধরেছি।

যেমন ধরুন, একটি ইউপিআই অ্যাপের অফার। সরাসরি লিখেছি, গ্রামে বা ছোট শহরে কীভাবে এই অ্যাপ ব্যবহার করে ক্যাশব্যাক পাওয়া যায়। অথবা ছোট দোকানদার কীভাবে ডিজিটাল পেমেন্টে সুবিধা পান।

এই লোকাল টাচটাই কাজ করেছে।

কনটেন্ট বানানোর পদ্ধতি

আমি কোনো শর্টকাটে যাইনি। প্রতিটি প্রোডাক্টের জন্য আলাদা কনটেন্ট বানিয়েছি। কনটেন্টের স্টাইল ছিল নিউজ রিপোর্টের মতো।

প্রথমে সমস্যা
তারপর সমাধানের কথা
এরপর সেই প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের ব্যবহার
শেষে নিজের মতামত

এতে পাঠকের বিশ্বাস তৈরি হয়। শুধু ভালো দিক নয়, কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও বলেছি। এতে মানুষ বুঝেছে, এটা বিজ্ঞাপন নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা।

কোথায় কনটেন্ট শেয়ার করেছি

সবচেয়ে বেশি কাজ এসেছে গুগল সার্চ থেকে। আমি এমন কিছু টপিক বেছে নিয়েছি যেগুলো মানুষ নিয়মিত খোঁজে।

যেমন
কোন অনলাইন টুলে ফ্রি ওয়েবসাইট বানানো যায়
ছোট ব্যবসার জন্য কোন পেমেন্ট অ্যাপ ভালো
নতুন ইউজার অফার কীভাবে পাওয়া যায়

এই ধরনের কিওয়ার্ড ধরে লেখা হয়েছে। ফেসবুকে খুব বেশি কাজ হয়নি। তবে হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস আর টেলিগ্রাম চ্যানেল থেকে কিছু কনভার্সন এসেছে।

৪৫ দিনের টাইমলাইন

প্রথম ১০ দিন
শুধু শেখা আর ভুল করা। আয় শূন্য।

পরের ১৫ দিন
কনটেন্ট ঠিকঠাক করা, লোকাল সমস্যা নিয়ে লেখা। এই সময় প্রথম কমিশন আসে প্রায় এক হাজার টাকার মতো।

শেষ ২০ দিন
কনটেন্ট সংখ্যা বাড়ে, পুরনো পোস্ট গুগলে র‍্যাংক করতে শুরু করে। এখানেই বড় অংশের আয় হয়।

সব মিলিয়ে ৪৫ দিনে মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ১২,৩০০ টাকা।

পেমেন্ট পাওয়ার অভিজ্ঞতা

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে, টাকা কি সত্যিই আসে। আমার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয়নি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা এসেছে। কোনো অজুহাত, কোনো কেটে নেওয়া হয়নি।

কারা এই কাজ করতে পারবেন

এই কাজ সবার জন্য নয়, আবার অসম্ভবও নয়।

যারা লিখতে পারেন
যারা নিয়মিত কাজ করতে পারেন
যারা রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন না

তাদের জন্য এই পথ কার্যকর।

যারা শুধু লিংক কপি করে ছড়াতে চান, তাদের জন্য নয়।

নতুনদের জন্য কিছু বাস্তব পরামর্শ

এক, শুরুতে কম আয়ে হতাশ হবেন না
দুই, নিজের অডিয়েন্স চিনুন
তিন, লোকাল সমস্যার সমাধান দিন
চার, ভুয়ো দাবি করবেন না
পাঁচ, ধৈর্য রাখুন

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এই ৪৫ দিনের অভিজ্ঞতা আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। এখন লক্ষ্য এক মাসে নিয়মিত আয় তৈরি করা। ধীরে ধীরে কনটেন্টের মান বাড়ানো, নতুন ক্যাটাগরি যোগ করা।

ইমপ্যাক্ট অ্যাফিলিয়েট কোনো জাদু নয়। এটা একটা টুল। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে ফল পাওয়া যায়।

শেষ কথা

অনলাইনে আয় নিয়ে অনেক গল্প শোনা যায়। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা কম মানুষই ভাগ করে। এই লেখাটা সেই অভিজ্ঞতারই অংশ। হয়তো আপনার আয় প্রথম মাসে শূন্য হবে, দ্বিতীয় মাসে পাঁচশো টাকা হবে। কিন্তু থেমে গেলে কিছুই হবে না।

আমি ৪৫ দিনে ১২,৩০০ টাকা আয় করেছি মানে এই নয় যে সবাই করবে। কিন্তু চেষ্টা করলে যে সম্ভব, সেটা নিজের চোখে দেখেছি।

আর সেটাই এই লেখার আসল কথা।

Know more: কন্টেন্ট লিখে কিভাবে টাকা আয় করা যায়? বাস্তব গাইড ও ভারতীয় উদাহরণ

Know more: ২০২৬ সালে অনলাইনে টাকা ইনভেস্ট করে দ্রুত আয় করার সেরা উপায়গুলো সম্পূর্ণ গাইড

2 thoughts on “আমি কিভাবে ইমপ্যাক্ট অ্যাফিলিয়েট ব্যবহার করে ৪৫ দিনে ১২,৩০০ টাকা আয় করেছি – বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সম্পূর্ণ গাইড”

Leave a Comment